সূচনা
তিন দিন আগে, ১১-ই ফেব্রুয়ারীতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতি প্রমাণিত হলো LIGO (Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) অবজারভেটরি'তে – আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্ত্ব প্রস্তাবনার প্রায় ১০০ বছর পরে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এই সনাক্তকরণের মাধ্যমে আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্ত্বের প্রতিপাদন পুরোপুরি শেষ হলো। আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্বের প্রথম ব্যবহারিক প্রমাণ আসে ১৯১৯ সালের মে’ মাসের পূর্ণগ্রাস সুর্যগ্রহণের সময়। পরীক্ষাটি ছিল ভরের উপস্থিতিতে স্থান-কালের বেঁকে যাবার বাস্তবতাকে প্রমাণ করা। স্থান-কালের বক্রতা পদার্থের ভরের সাথে সম্পৃক্ত – আর সূর্যের মতো বিশাল ভরের মাধ্যমে তার কাছাকাছি স্থান-কালে এই বক্রতা মোটামুটি পরিমাপযোগ্য পরিমিতিতে আসে। আরেকটু ব্যাখ্যার জন্যে নিচের ছবিটি দেখা যাক। সূর্যের ভরের জন্যে তার অব্যবহিত সংস্পর্শে থাকা বক্র স্থান-কালের বুননের উপর দিয়ে দূর নক্ষত্র থেকে আসা আলোকরশ্মি বেঁকে যায়। ফলে নক্ষত্রটিকে মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত অবস্থায় দেখা যাবে। পদার্থবিদ্যার ভাষায় একে বলে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। ১৯১৯ সালের সুর্যগ্রহণের সময় স্যার আর্থার এডিংটন এই পরীক্ষাটিই করেছিলেন – প্রিস্সিপে দ্বীপে। তিনি বৃষ নক্ষত্ররাজির (Taurus সমাবেশ) বেশ কিছু তারার বিচ্যুতি মেপে দেখলেন যে, পরিমিতি আইনস্টাইনের ভবিষ্যতবাণীর সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।
গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং-এর মাধ্যমের স্থান-কালের বক্রতার পরিমাপের পরীক্ষা ছাড়াও আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্বের প্রতিপাদনকল্পে আরো অনেক পরীক্ষাই আগে হয়েছে – আর প্রতি বারই তা সফল ভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে। উৎসাহী পাঠকবর্গ এখানে গিয়ে বিস্তারিত দেখতে পারেন। তবে এই প্রথম বার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতির পরিমাপ ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেল LIGO-তে। যদিও এর আগে বাইনারি পালসার নক্ষত্রের ক্ষেত্রে পরোক্ষ ভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর জন্যে ১৯৯৩ সালে রাসেল হালস ও হুটন টেইলর পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার পান।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কী?
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কী এবং এর প্রকৃতি কেমন? এ নিয়ে এবার কিছু বলা যাক।
স্থির পানিতে ঢিল ছুঁড়লে যেভাবে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তেমনি ভারী বস্তুর চলন স্থান-কালের ফেব্রিকে তরঙ্গের ঊর্মিমালা তৈরী করে। আর স্বভাবতই বেশি ভারী বস্তু পানিতে ছুঁড়লে যেভাবে বেশি মাত্রার তরঙ্গ তৈরী করে, সেভাবে বেশি ভারী বস্তু স্থান-কালের ফেব্রিকে অন্য ভারী বস্তুর সাথে মিথস্ক্রিয়া করে বেশি মাত্রার কিংবা উচ্চাঙ্গের তরঙ্গ তৈরী করে। প্রায় বৃত্তাকার কক্ষে থাকা পৃথিবীর চাইতে, বেশ তির্যক উপবৃত্তাকার কক্ষে থাকা গ্রহ পেরিহিলিয়নের (কক্ষপথের সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি বিন্দু) কাছাকাছি অবস্থানে বেশি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরী করবে। তবে পাঠকবর্গ নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন যে, বেশ ভারী দু'টো মহাজাগতিক বস্তু যখন একে অপরের কাছাকাছি এসে প্রবল বেগে একীভূত হয়ে যাবে – তখন নিশ্চয়ই বেশ উচ্চাঙ্গের মহাকর্ষীয় ঊর্মিমালা স্থান-কালের ফেব্রিকে তৈরী করবে। অনুমানটা সত্য এবং LIGO-তে প্রমাণ পাওয়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে দু'টো কৃষ্ণ-বিবরের (Black Hole) একীভূত হয়ে যাবার সময়কার তৈরী সিন্ধু-হিন্দোল। প্রায় ১.৩ বিলিয়ন বছর আগে ঘটা এই মহাজাগতিক ঘটনাই এখন ধরা পড়লো ওয়াশিংটন আর লুইসিয়ানা'তে তৈরী করা দু'টো ডিটেক্টরে।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কেমন – শব্দ তরঙ্গের মতো, না আলোক তরঙ্গের মতো? একেবারে সুক্ষ্মভাবে বলতে গেলে এই দু'ধরণের তরঙ্গের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবার নিজের মতো করেই কিছুটা অনন্য। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কম্পাঙ্ক মাইক্রোহার্টজ থেকে কিলোহার্টজ পর্যন্ত – অর্থাৎ তরঙ্গের মূল শক্তি নিহিত আছে শ্রুতিগোচর কম্পাঙ্কের মধ্যে। সেই অর্থে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, শব্দ তরঙ্গের মতো – অর্থাৎ একে শোনা যায়। আর LIGO টিম ০.৫ সেকেন্ড দৈর্ঘের মহাকর্ষীয় সঙ্গীতের ব্যঞ্জনা প্রকাশও করেছে। আবার অন্যভাবে দেখলে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পোলারাইজড – অর্থাৎ, দু'টো উলম্ব অক্ষের প্রেক্ষিতে এদের উপাংশিক অভিক্ষেপ পাওয়া যায়। গ্যাস ও তরলের মধ্যে শব্দ তরঙ্গের ক্ষেত্রে পোলারাইজেশন দেখা যায়না। তাই সে অর্থে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শব্দ তরঙ্গ থেকে আলাদা। অন্যদিকে আলোক কিংবা বিদুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে পোলারাইজেশন সবসময়ই দেখা যায়। তাই সেই অর্থে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আলোক তরঙ্গের মতো। পোলারাইজেশনের জন্যে – যখন এক্স-অক্ষের সাপেক্ষে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিস্তার সর্বোচ্চ, ঠিক সেই সময় ওয়াই-অক্ষের সাপেক্ষে এই তরঙ্গের বিস্তার হয় সর্বনিম্ন। নিচের ছবি থেকে তা কিছুটা পরিষ্কার হতে পারে।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বোঝার জন্যে আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। আমার আগের এক লেখাতে স্থানিকতার নীতি সম্পর্কে বলেছিলাম। সেখানে সূর্য 'নাই' হয়ে যাবার একটা থট এক্সপেরিমেন্ট এর কথা বলেছিলাম। আগের সেই লেখাটির প্রযোজ্য অংশটুকু নিচে তুলে দেয়া হলো।
নিউটনের মহাকর্ষের সুত্র মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি পদার্থের মধ্যকার আকর্ষণ বলের পরিমাপ বলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এই বলের প্রয়োগ কি তৎক্ষণাত (instantaneous), এই প্রশ্নের উত্তরে নিউটন বলেন, ‘হ্যাঁ বলের প্রয়োগ তৎক্ষণাত।’ একটা হাইপোথ্যাটিক্যাল থট এক্সপেরিমেন্ট করুন। মনে করুন, ঠিক এই মুহুর্তে সূর্য একেবারে গায়েব হয়ে গেলো; অর্থাৎ, সৌতজগতের কেন্দ্রে সূর্য আর নেই, একেবারে নাই/গায়েব হয়ে গেছে। তাহলে পৃথিবীসহ অন্য গ্রহগুলো কখন/কত-সময় পরে কক্ষচ্যুত হবে? সূর্য যে একেবারে গায়েব হয়ে গেছে, এটা বুঝতে অন্তত ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় লাগবে, এটা সহজেই বোঝা যায়, কেননা এই সময়টুকু লাগে সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে এসে পৌছুঁতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আলো পৌঁছুতে তো ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড লাগলো, ভালো; কিন্তু নাই হয়ে যাওয়া সূর্যের মহাকর্ষ বল থেকে মুক্ত হয়ে পৃথিবী কখন কক্ষচ্যুত হবে? নিউটনের মহাকর্ষ বলের প্রয়োগনীতি অনুযায়ী কক্ষচ্যুতি হবে সাথে সাথেই, অর্থাৎ আলোর confirmation পৌঁছার আগেই মহাকর্ষ বলের প্রয়োগ থেকে পৃথিবী মুক্ত হয়ে যাবে ও সেজন্যে সেই মূহুর্তেই তা কক্ষচ্যুত হয়ে যাবে। কিন্তু আইনষ্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে মহাকর্ষ বলকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে আসে। তিনি দেখান যে ভর (mass) স্থান-কালকে (spacetime) বক্র করে দেয়; এবং এই বক্রতার (curvature) বহিপ্রকাশই মূলত মহাকর্ষ। নীচের ছবিতে দেখুন সূর্যের ভর কীভাবে স্থান-কালের গঠন/বুনন কে বক্র করে দিয়েছে ও তাতে পৃথিবীর সাথে মহাকর্ষ বলের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে কীভাবে স্থান-কালের বক্রতার মাধ্যমেই অভিকর্ষ বল প্রযুক্ত হয়। এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টের সূর্য যদি হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়, তবে স্থান-কালের বক্রতা মসৃণ হতে থাকবে। কিন্তু এই মসৃণ হবার গতি আলোর বেগের সমান। সুতরাং, পৃথিবীর সূর্যের মহাকর্ষ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে কক্ষচ্যুত হতে সময় লাগবে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডই। অর্থাৎ, সূর্যের হঠাৎ নাই হয়ে যাবার ব্যাপারটা যখন আমরা বুঝবো ঠিক সেই সময়েই পৃথিবীও পুরোপুরি কক্ষচ্যুত হবে। এই প্রস্তাবনাটা নিউটনের মহাকর্ষ বলের তৎক্ষণাত প্রয়োগ (instantaneous assertion) নীতির বিরাট পরিশীলন। আইনষ্টাইন আরো বলছেন মহাবিশ্বে আলোর গতিই কেবল absolute ও সর্বোচ্চ। কোনো পদার্থ কিংবা তথ্য আলোর বেগের চাইতে বেশী বেগে চলতে পারেনা। স্থানিকতার নীতির প্রকাশ আমরা উপরের থট এক্সপেরিমেন্টেও দেখতে পাই। সূর্য হঠাৎ গায়েব হয়ে গেলেও সেটা তৎক্ষণাত পৃথীবিকে প্রভাবিত করবেনা; কেননা, তারা স্থান দ্বারা পৃথককৃত। প্রভাবিত হতে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড লেগে যাবে; কেননা, ততক্ষন সময় লাগে প্রভাবিত করার এজেন্ট (আলো ও স্থান-কালের মসৃণতা) পৃথিবীতে এসে পৌঁছুতে।
ওই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিষয়টা প্রোথিত আছে নিবিড়ভাবে। প্রথমত নিউটনীয় ধারণায় 'সূর্য নাই' হয়ে যাবার সাথে সাথেই পৃথিবী কক্ষচ্যুত হয়ে যাবে কেননা নিউটনীয় ধারণায় মহাকর্ষীয় বলের প্রয়োগ তৎক্ষনাত। আইনস্টাইনের মহাকর্ষের মডেলে স্থান-কালের বক্রতা যেহেতু মহাকর্ষীয় বলে প্রায়োগিক এজেন্ট – তাই 'সূর্য নাই' হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও (সূর্য নাই হয়ে গেলে ধীরে ধীরে সূর্যের অব্যবহিত স্থান-কাল মসৃণ হয়ে যেতে থাকবে – কেননা ভর না থাকলে স্থান-কালের ফেব্রিক মসৃণ থাকে, অর্থাৎ এতে কোনো বক্রতা থাকেনা) স্থান-কালের মসৃণতা ফিরে পাওয়া ঘটবে স্থান-কালে'র উপর দিয়ে প্রবাহিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কালক্রমে ম্রিয়মান হওয়া হিল্লোল সৃষ্টির মাধ্যমে। আর মহাকর্ষীয় এই তরঙ্গ স্থান কালের উপর দিয়ে চলে আলোর বেগের সমান বেগে। তাই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঊর্মিমালা পৃথিবীতে এসে পৌছুতে লেগে যাবে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড – আর তাই ওই সময়টুক পরে পৃথিবী কক্ষচ্যুত হবে।
আইনস্টাইনের তত্ত্বে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গতি আলোর বেগের সমান পাবার কারণেও তিনি ভাবতেন যে মহাকর্ষ আর বিদ্যুত-চুম্বকীয় বল আদতে একই ফ্রেমে বাঁধা – আর এই একীভূত তত্ত্ব পাবার চেষ্টা তিনি করেছেন তাঁর জীবনের শেষ ত্রিশটি বছর।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মোটামুটি সর্বভেদ্য। স্থান-কালের ফেব্রিকের উপর দিয়ে যেহেতু সব পদার্থ আর শক্তি চলাচল করে তাই এই ফেব্রিক সব কিছুর মধ্যেই নিমজ্জিত। তাই ফলস্বরূপ যখন পোলারাইজড মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আপনার উপর এসে পড়বে তখন একই সাথে আপনার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিচ্যুতি ঘটবে। যেমন ধরুন তরঙ্গের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন প্রসারণ ও সংকোচন যদি হয় ৬ ইঞ্চি তবে যখন এই তরঙ্গ আপনার উপর দিয়ে যাবে তখন তরঙ্গ হিন্দোলের সাথে সাথে আপনার উচ্চতা আর প্রস্থ যুগপদ ৬ ইঞ্চি করে বাড়তে/কমতে থাকবে (Oscillate) তরঙ্গের কম্পাঙ্ক অনুসারে। মজার ব্যাপার বটে!!!
LIGO-তে করা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাবার পরীক্ষা
এবার LIGO-তে করা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাবার পরীক্ষাটি সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত বলা যাক।
পরীক্ষা যন্ত্রটি আসলে একটা ব্যাতিচার নিরূপক (Interferometer)। এর সমকোণী দু'টি বহু আছে যাদের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার। LIGO ডিটেক্টর স্থাপিত হয়েছে দুটি – প্রথমটি ওয়াশিংটন স্টেট'এর হ্যানফোর্ডে আর দ্বিতীয়টি রয়েছে লুইসিয়ানার লিভিংস্টোন-এ। LIGO মূলত Caltech, MIT-সহ আরো কিছু সহযোগী সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়। এর ফান্ডিং-এ আছে যুক্তরাষ্ট্রের NSF-সহ আরো অনেক দেশের বিজ্ঞান গবেষণার রাষ্ট্রীয় অনুদান দাতারা। এতে নয় শতাধিক বিজ্ঞানী ছাড়াও আছে ৪৪,০০০ স্বেচ্ছাসেবী অন্বেষক, যারা ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং এর সাহায্যে LIGO এর ড্যাটা অনুসন্ধান করে থাকে – মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতি নিরূপন করার জন্যে। তাত্ত্বিক ভাবে LIGO ডিটেক্টর লেজার রশ্মিকে অর্ধস্বচ্ছ আয়না দিয়ে দু'ভাগ করে এর দু'বাহুতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাহুগুলোর বিপরীত প্রান্তে আছে প্রতিফলক আয়না – যা আলোক রশ্মিগুলোকে প্রতিফলিত করে আবার অর্ধস্বচ্ছ আয়নার দিকে ফিরিয়ে আনে। ফিরে আসার পরে দু'বাহুর রশ্মিকে একীভূত করে পাঠিয়ে দেয়া হয় ইন্টারফেরোমিটারে। আর দু'বাহুর দৈর্ঘ্য এমন ভাবে ঠিক করা হয় যাতে ফিরে আসা রশ্মিগুলো ধ্বংসাত্মক দশায় মিলিত হয়।
এখন যখন পোলারাইজড মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এই দু'বাহুর উপর দিয়ে যাবে তখন তাদের একটি বাহু যখন সম্প্রসারিত পোলারাইজেশনে পড়ে তখন অপর বাহু পড়ে সংকুচিত পোলারাইজেশনের দশায়। তাই দু'বাহুতে একে অপরের সাপেক্ষে অতি সামান্য দৈর্ঘ্য বিচ্যুতি দেখা দেয়। আর এই দৈর্ঘ্য বুচ্যুতি তখন ধরা পড়ে ইন্টারফেরোমিটারে বড় সংকেতের আকারে। তবে তাত্ত্বিক ভাবে সহজ হলেও সার্বিক পরীক্ষাটি বেশ আয়াসসাধ্য ও জটিল। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বেশ দুর্বল – তাই কোনো ধরণের অনাকাঙ্খিত নয়েস যাতে পরীক্ষাতে ঋণাত্মক প্রভাব না ফেলে সেজন্যে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সিস্টেমের ঘড়ি ও যন্ত্রপাতিও বেশ সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল। ২০০২ সালে প্রথম চালু হলেও যন্ত্রপাতির সূক্ষ্মতা ঠিক না থাকায় ২০১০ সাল থেকে এর আপগ্রেডের কাজ শুরু হয়। এই আপগ্রেডেড যন্ত্রপাতি দিয়ে LIGO ২০১৫ সালে সেপ্টেম্বর থেকে আবার কাজ শুরু করে। এতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখের একটা মহাকর্ষীয় ইভেন্ট (ইভেন্ট'টির নাম দেয়া হয়েছে GW150914 – মানে, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ – ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে পাওয়া) দিয়ে ড্যাটা প্রসেসিং শুরু করে। মহাকর্ষীয় ইভেন্টটি ছিল দুটি কৃষ্ণ বিবরের একীভূত হবার ঘটনা। একীভূত হবার আগে এদের ভর ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩৬ (+৫/-৪) ও ২৯ (+৪/-৪) সৌরভর – আর পরে প্রায় ৬২ (+৪/-৪) সৌরভর। প্রায় ৩ (+০.৫/-০.৫) সৌরভরের যে ঘাটতি আছে তা একীভূত হবার পরে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ রূপে বিকিরিত হয়ে যায়। ১.৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের সেই কৃষ্ণ বিবর দু'টির একীভূত হবার ফলে বিকিরিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঊর্মিমালা এসে অবশেষে ধরা পড়ল ওয়াশিংটন আর লুইসিয়ানাতে থাকা দু'টো ডিটেক্টরে।
চিত্র ৭: মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রাপ্তির গ্রাফ। উপরে সময়ের সাপেক্ষে পাওয়া পর্যবেক্ষিত আপেক্ষিক দৈর্ঘ্য বিচ্যুতি – নিচে সময়ের সাপেক্ষে পর্যবেক্ষিত দৈর্ঘ্য বিচ্যুতির কম্পাঙ্কের বিন্যাস।
চিত্র ৮: সময়ের সাপেক্ষে কৃষ্ণ বিবর দুটির কাছাকছি আসা থেকে শুরু হয়ে একীভূত হওয়া ও পরবর্তী আত্তিকরণের গতিপ্রকৃতি।
ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে যে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেতটির ঊর্ধমুখী বিক্ষেপ ৩৫ থেকে ২৫০ হার্টজ যার সর্বোচ্চ মহাকর্ষীয় তারঙ্গিক প্রসারণ ১.০x১০(-২১)। এই পরিমিতি আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্বের আলোকে পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে দুটো কৃষ্ণবিবরের একীভূত হবার প্রাক্কালে উদ্ভুত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিধৃতির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। GW150914 প্রথমে লিভিংস্টোনে ধরা পড়ে আর তার ৬.৯ মিলিসেকেন্ড পরে ধরা পড়ে হ্যানফোর্ডে। ৬.৯ মিলিসেকেন্ড সময়ের পার্থক্য আলোর বেগে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রগমন লিভিংস্টোন ও হ্যানফোর্ড স্থানিক দূরত্বের পরিমাপক। দুটি আলাদা ডিটেক্টরে একই ধরণের পুনরাবৃত্তি ও সময়ের ব্যবধানের সাথে তরঙ্গের বেগের হিসেব মিলে যাওয়া – GW150914 ইভেন্টের কনফিডেন্স লেভেল বাড়িয়ে দেয়। LIGO টিম প্রকাশ করে যে, তাদের এই হিসেবের ভুল হবার পরিমিতি ২০৩ হাজার বছরে একবার।
চিত্র ৯: চিত্র ৭ ও ৮ এর সমন্বিত চিত্র। এখানে কৃষ্ণ বিবর দুটোর কাছাকাছি আসার আপেক্ষিক গতি ও দূরত্ব দেখানো হয়েছে।
এই চিত্রে দেখা যাচ্ছে যখন কৃষ্ণবিবর দুটো সর্পিলাকারে অবর্তমান (বামে), তারপরে তারা মিলিত হয়ে একীভূত হলো (Merger – ডানে) আর একীভূত হবার পরের আত্তীকরণ (Ringdown – ডানে) । সাথে উপরের গ্রাফের নিচে দেখা যাচ্ছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রসারণের মাত্রা। নিচে কৃষ্ণবিবর দুটো একীভূত হবার প্রাক্কালে তাদের মধ্যকার দুরত্ব ও বেগের গ্রাফ দেখানো হচ্ছে। নিচের ডান দিকে দেখানো হচ্ছে সোয়ার্জচাইল্ড এর ব্যাসার্ধের আলোকে বিবর দুটোর আপেক্ষিক স্থানিক দূরত্ব।
ভবিষ্যত
আইনস্টাইনের প্রস্তাবনার প্রায় ১০০ বছর পরে তার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে তার করা প্রেডিকশন মিলে যাওয়া এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এই প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ প্রত্যক্ষ ভাবে নিরূপণ করাতে সফল হওয়া জ্যোতির্বিদ্যার জগতে ঘটে যাওয়া এক বিপ্লব। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আলোকে জ্যোতির্বিদ্যার জগতে এক ভিন্ন শাখা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ ছিল এখন পর্যন্ত আমাদের মহাকাশ নিরীক্ষণের একমাত্র সহায়। প্রথম দিকে তা ছিল কেবল দৃশ্যমান আলোর সাহায্যে মহাকাশ দেখা, যেমন দেখেছিলেন গ্যালিলিও কিংবা নিউটন, টেলিস্কোপ দিয়ে – পরে তাতে যুক্ত হয় অব-লোহিত, অতিবেগুনি, এক্স কিংবা গামা রশ্মির মতো অদৃশ্য বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গমালার বর্ণালীও। প্রতিটি আলাদা উপাদান থেকে আমরা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে কিছু আলাদা তথ্য পাই যা ইতোমধ্যে জানা তথ্যের সাথে একীভূত হয়ে আমাদের আরো পরিষ্কার সামগ্রিক চিত্র দেখায়। এখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আলোকে জ্যোতির্বিদ্যার আগমনে মহাকাশ নিরীক্ষণের সম্পূর্ণ আলাদা একটা পথ আমাদের জন্যে খুলে গেল। আর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ এর চাইতে মৌলিক ভাবে আলাদা হওয়াতে এর সাহায্যে আমরা মহাকাশ সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানতে পারব যা বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের সাহায্যে কোনভাবেই জানা সম্ভব নয়। বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের একটা মৌলিক গুণ হচ্ছে এটা পদার্থের সাথে নানা ভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। যেমন দৃশ্যমান আলোর কথাই ধরুন, আলো যখন কোনো বস্তুর উপর আপতিত হয় তখন এক কিয়দংশ শোষিত হয়, কিছু অংশ হয় প্রতিফলিত, প্রতিসরিত ও বিচ্ছুরিত। আলো আবার কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তের ভেতরের তথ্য আমাদের দিতে পারেনা। এমনকি ঘটনা দিগন্তের বাইরেও আলো স্থান-কালের বক্রতায় চিরন্তন ঘুর্নিপাক খেতে পারে (সূর্যের চারিদিকে গ্রহের আবর্তনের মতো)। কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলো থাকেনা। পদার্থের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া কম, কিংবা নিদেনপক্ষে আলাদা। আলো যেমন অনেক প্রতিবন্ধকতা ভেদ করতে পারেনা – সেক্ষেত্রে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বলতে গেলে সর্বভেদ্য – অর্থাৎ এটি সব কিছুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। অবশ্য প্রবাহিত হবার সময় পদার্থের দৈর্ঘ্যকে সে প্রসারিত কিংবা সংকুচিত করে। কিন্তু এর সর্বভেদ্যতার ধর্ম একে বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের সাপেক্ষে এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে আসে। অর্থাৎ মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছুই জানতে পারবো যা বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে কৃষ্ণ বিবরের ঘটনা দিগন্তের মধ্যকার বিষয়াদিও জানা হয়ত সম্ভবপর হবে। আরো হয়ত জানা যাবে বিগ ব্যাং ও এর অব্যবহিত পরের মহাবিশ্বের চিত্রপট। আলোক তরঙ্গের সাহায্যে আমরা মহাবিশ্বের জন্মের ৩৮০ হাজার বছরের পরের ঘটনাগুলো জানতে পারি। ইলেক্ট্রন আর প্রোটনের সম্মিলনে অণু তৈরী হওয়া শুরু করে বিগ ব্যাং এর ৩৮০ হাজার বছর পরে। আমরা বর্তমান বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক টেলিস্কোপ দিয়ে ওই সময়টুকু পর্যন্ত মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে দেখতে ও জানতে পারি। ওই সময়ের আগে মহাবিশ্ব ছিল ইলেক্ট্রন, প্রোটন আর ফোটনের মিশ্রিত প্লাজমার মতো – তাই বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক টেলিস্কোপ এর কাছে তা ঝাপসা কিংবা অস্বচ্ছ। কিন্ত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক জ্যোতির্বিদ্যায় সেই সীমাবদ্ধতাটুকু থাকছেনা। পরন্তু বিগ ব্যাং এর পরে মহাকর্ষীয় বল ছিল সবচাইতে প্রবল – বিকর্ষী মহাকর্ষীয় বল শুরুতেই মহাবিশ্বের অস্বাভাবিক স্ফীতির জন্যে দায়ী বলে ধরা হয়। তা অবশ্যই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ভিত্তিক জ্যোতির্বিদ্যার এই নতুন শাখা আমাদের সময়ের সাপেক্ষে আরো অনেক পেছনে দেখতে সাহায্য করবে। তাত্ত্বিক ভাবে বলা যায় যে, প্রায় বিগ ব্যাং এর পরের মুহূর্তটুকু সম্পর্কেও আমরা জানতে পারব এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক জ্যোতির্বিদ্যায়।
এই লক্ষ্যে ESA (European Space Agency) আর জাপান এগিয়েও চলছে। ESA, eLISA (Evolved Laser Interferometer Space Antenna) নামের লেজার ভিত্তিক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরূপক মহাকাশে পাঠাবার লক্ষ্যে কাজ করছে। eLISA হচ্ছে মহাকাশে স্থাপিতব্য একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুসন্ধক যেখানে তিনটি আলাদা মহাকাশ প্রোব একসাথে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরূপক হিসেবে কাজ করবে। এই লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে LISA Pathfinder নামের একটি মিশন ইতোমধ্যে মহাকাশে পাঠিয়েছে ESA। এটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুসন্ধান করবেনা – বরং তার পরবর্তিতে মূল eLISA মিশনের জন্যে প্রয়োজনীয় অনেক প্রযুক্তিগত চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে।
চিত্র ১০: eLISA সমাবেশ (Constellation) এর প্রস্তাবিত চিত্র। এটি লেজার-ভিত্তিক ইন্টারফেরোমিটার যা পৃথিবীর কক্ষে স্থাপিত হবে বলে প্রস্তাবিত।
সব কিছু ঠিক থাকলে eLISA সমাবেশ ২০৩৪ সালে মহাকাশে উৎক্ষিপ্ত হবে। সমাবেশ এর তিনটি প্রোব সমবাহু ত্রিভুজের আকারে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে সাজানো হবে। সামগ্রিক ভাবে সমাবেশ সিস্টেম চাঁদের কক্ষ থেকে ১০ গুন দূরে অবস্থিত হবে। তাই পৃথিবীর সাপেক্ষে প্রোবগুলো স্থির অবস্থানে থাকবে। সমবাহু ত্রিভুজের প্রতিটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক কোটি কিমি। আর এটিও LIGO এর মতো লেজার ইন্টারফেরোমিটার হিসেবে কাজ করবে। তবে প্রস্তাবিত অঞ্চলে পৃথিবী আর সূর্যের উভয়ের মহাকর্ষিক প্রভাব একে অপরকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে দেয় বলে ব্যাকগ্রাউন্ডে পৃথিবী ও সূর্যের প্রভাবে তৈরী মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাব এতে কম থাকবে – আর তাই এটি দিয়ে মহাকাশের নানা অঞ্চল থেকে আসা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সুনিপুনভাবে মেপে দেখা যাবে। এর সামগ্রিক সূক্ষ্মতা পার্থিব নিরূপকদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি হবে।
আশা করা যায় তখন চোখ দিয়ে (বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ) মহাকাশ দেখার পাশাপাশি কান দিয়েও (মহাকর্ষীয় তরঙ্গ) মহাকাশকে শোনা ও বোঝা যাবে। এতে করে মহাবিশ্বের অনেক অজানা রহস্য হয়ত মানব জাতির সামনে উন্মোচিত হবে।
তিন দিন আগে, ১১-ই ফেব্রুয়ারীতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতি প্রমাণিত হলো LIGO (Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) অবজারভেটরি'তে – আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্ত্ব প্রস্তাবনার প্রায় ১০০ বছর পরে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এই সনাক্তকরণের মাধ্যমে আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্ত্বের প্রতিপাদন পুরোপুরি শেষ হলো। আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্বের প্রথম ব্যবহারিক প্রমাণ আসে ১৯১৯ সালের মে’ মাসের পূর্ণগ্রাস সুর্যগ্রহণের সময়। পরীক্ষাটি ছিল ভরের উপস্থিতিতে স্থান-কালের বেঁকে যাবার বাস্তবতাকে প্রমাণ করা। স্থান-কালের বক্রতা পদার্থের ভরের সাথে সম্পৃক্ত – আর সূর্যের মতো বিশাল ভরের মাধ্যমে তার কাছাকাছি স্থান-কালে এই বক্রতা মোটামুটি পরিমাপযোগ্য পরিমিতিতে আসে। আরেকটু ব্যাখ্যার জন্যে নিচের ছবিটি দেখা যাক। সূর্যের ভরের জন্যে তার অব্যবহিত সংস্পর্শে থাকা বক্র স্থান-কালের বুননের উপর দিয়ে দূর নক্ষত্র থেকে আসা আলোকরশ্মি বেঁকে যায়। ফলে নক্ষত্রটিকে মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত অবস্থায় দেখা যাবে। পদার্থবিদ্যার ভাষায় একে বলে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। ১৯১৯ সালের সুর্যগ্রহণের সময় স্যার আর্থার এডিংটন এই পরীক্ষাটিই করেছিলেন – প্রিস্সিপে দ্বীপে। তিনি বৃষ নক্ষত্ররাজির (Taurus সমাবেশ) বেশ কিছু তারার বিচ্যুতি মেপে দেখলেন যে, পরিমিতি আইনস্টাইনের ভবিষ্যতবাণীর সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।
গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং-এর মাধ্যমের স্থান-কালের বক্রতার পরিমাপের পরীক্ষা ছাড়াও আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্বের প্রতিপাদনকল্পে আরো অনেক পরীক্ষাই আগে হয়েছে – আর প্রতি বারই তা সফল ভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে। উৎসাহী পাঠকবর্গ এখানে গিয়ে বিস্তারিত দেখতে পারেন। তবে এই প্রথম বার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতির পরিমাপ ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেল LIGO-তে। যদিও এর আগে বাইনারি পালসার নক্ষত্রের ক্ষেত্রে পরোক্ষ ভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর জন্যে ১৯৯৩ সালে রাসেল হালস ও হুটন টেইলর পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার পান।
![]() |
| চিত্র ২: বাইনারি পালসার সিস্টেমে দুটো নক্ষত্র একে অপরের চারিদিকে সর্পিলাকারে অবর্তমান – ফলে স্থান-কালের ফেব্রিকে তৈরী হচ্ছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঊর্মিমালা। |
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কী?
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কী এবং এর প্রকৃতি কেমন? এ নিয়ে এবার কিছু বলা যাক।
স্থির পানিতে ঢিল ছুঁড়লে যেভাবে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তেমনি ভারী বস্তুর চলন স্থান-কালের ফেব্রিকে তরঙ্গের ঊর্মিমালা তৈরী করে। আর স্বভাবতই বেশি ভারী বস্তু পানিতে ছুঁড়লে যেভাবে বেশি মাত্রার তরঙ্গ তৈরী করে, সেভাবে বেশি ভারী বস্তু স্থান-কালের ফেব্রিকে অন্য ভারী বস্তুর সাথে মিথস্ক্রিয়া করে বেশি মাত্রার কিংবা উচ্চাঙ্গের তরঙ্গ তৈরী করে। প্রায় বৃত্তাকার কক্ষে থাকা পৃথিবীর চাইতে, বেশ তির্যক উপবৃত্তাকার কক্ষে থাকা গ্রহ পেরিহিলিয়নের (কক্ষপথের সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি বিন্দু) কাছাকাছি অবস্থানে বেশি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ তৈরী করবে। তবে পাঠকবর্গ নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন যে, বেশ ভারী দু'টো মহাজাগতিক বস্তু যখন একে অপরের কাছাকাছি এসে প্রবল বেগে একীভূত হয়ে যাবে – তখন নিশ্চয়ই বেশ উচ্চাঙ্গের মহাকর্ষীয় ঊর্মিমালা স্থান-কালের ফেব্রিকে তৈরী করবে। অনুমানটা সত্য এবং LIGO-তে প্রমাণ পাওয়া মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে দু'টো কৃষ্ণ-বিবরের (Black Hole) একীভূত হয়ে যাবার সময়কার তৈরী সিন্ধু-হিন্দোল। প্রায় ১.৩ বিলিয়ন বছর আগে ঘটা এই মহাজাগতিক ঘটনাই এখন ধরা পড়লো ওয়াশিংটন আর লুইসিয়ানা'তে তৈরী করা দু'টো ডিটেক্টরে।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কেমন – শব্দ তরঙ্গের মতো, না আলোক তরঙ্গের মতো? একেবারে সুক্ষ্মভাবে বলতে গেলে এই দু'ধরণের তরঙ্গের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবার নিজের মতো করেই কিছুটা অনন্য। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কম্পাঙ্ক মাইক্রোহার্টজ থেকে কিলোহার্টজ পর্যন্ত – অর্থাৎ তরঙ্গের মূল শক্তি নিহিত আছে শ্রুতিগোচর কম্পাঙ্কের মধ্যে। সেই অর্থে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, শব্দ তরঙ্গের মতো – অর্থাৎ একে শোনা যায়। আর LIGO টিম ০.৫ সেকেন্ড দৈর্ঘের মহাকর্ষীয় সঙ্গীতের ব্যঞ্জনা প্রকাশও করেছে। আবার অন্যভাবে দেখলে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পোলারাইজড – অর্থাৎ, দু'টো উলম্ব অক্ষের প্রেক্ষিতে এদের উপাংশিক অভিক্ষেপ পাওয়া যায়। গ্যাস ও তরলের মধ্যে শব্দ তরঙ্গের ক্ষেত্রে পোলারাইজেশন দেখা যায়না। তাই সে অর্থে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শব্দ তরঙ্গ থেকে আলাদা। অন্যদিকে আলোক কিংবা বিদুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে পোলারাইজেশন সবসময়ই দেখা যায়। তাই সেই অর্থে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আলোক তরঙ্গের মতো। পোলারাইজেশনের জন্যে – যখন এক্স-অক্ষের সাপেক্ষে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিস্তার সর্বোচ্চ, ঠিক সেই সময় ওয়াই-অক্ষের সাপেক্ষে এই তরঙ্গের বিস্তার হয় সর্বনিম্ন। নিচের ছবি থেকে তা কিছুটা পরিষ্কার হতে পারে।
![]() |
চিত্র ৩: মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি ও স্থান-কালের একটি প্রস্থচ্ছেদের মধ্যে এর পোলারাইজড বিস্তারের চিত্রায়ন। |
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বোঝার জন্যে আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। আমার আগের এক লেখাতে স্থানিকতার নীতি সম্পর্কে বলেছিলাম। সেখানে সূর্য 'নাই' হয়ে যাবার একটা থট এক্সপেরিমেন্ট এর কথা বলেছিলাম। আগের সেই লেখাটির প্রযোজ্য অংশটুকু নিচে তুলে দেয়া হলো।
নিউটনের মহাকর্ষের সুত্র মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি পদার্থের মধ্যকার আকর্ষণ বলের পরিমাপ বলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এই বলের প্রয়োগ কি তৎক্ষণাত (instantaneous), এই প্রশ্নের উত্তরে নিউটন বলেন, ‘হ্যাঁ বলের প্রয়োগ তৎক্ষণাত।’ একটা হাইপোথ্যাটিক্যাল থট এক্সপেরিমেন্ট করুন। মনে করুন, ঠিক এই মুহুর্তে সূর্য একেবারে গায়েব হয়ে গেলো; অর্থাৎ, সৌতজগতের কেন্দ্রে সূর্য আর নেই, একেবারে নাই/গায়েব হয়ে গেছে। তাহলে পৃথিবীসহ অন্য গ্রহগুলো কখন/কত-সময় পরে কক্ষচ্যুত হবে? সূর্য যে একেবারে গায়েব হয়ে গেছে, এটা বুঝতে অন্তত ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় লাগবে, এটা সহজেই বোঝা যায়, কেননা এই সময়টুকু লাগে সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে এসে পৌছুঁতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আলো পৌঁছুতে তো ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড লাগলো, ভালো; কিন্তু নাই হয়ে যাওয়া সূর্যের মহাকর্ষ বল থেকে মুক্ত হয়ে পৃথিবী কখন কক্ষচ্যুত হবে? নিউটনের মহাকর্ষ বলের প্রয়োগনীতি অনুযায়ী কক্ষচ্যুতি হবে সাথে সাথেই, অর্থাৎ আলোর confirmation পৌঁছার আগেই মহাকর্ষ বলের প্রয়োগ থেকে পৃথিবী মুক্ত হয়ে যাবে ও সেজন্যে সেই মূহুর্তেই তা কক্ষচ্যুত হয়ে যাবে। কিন্তু আইনষ্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে মহাকর্ষ বলকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে আসে। তিনি দেখান যে ভর (mass) স্থান-কালকে (spacetime) বক্র করে দেয়; এবং এই বক্রতার (curvature) বহিপ্রকাশই মূলত মহাকর্ষ। নীচের ছবিতে দেখুন সূর্যের ভর কীভাবে স্থান-কালের গঠন/বুনন কে বক্র করে দিয়েছে ও তাতে পৃথিবীর সাথে মহাকর্ষ বলের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে কীভাবে স্থান-কালের বক্রতার মাধ্যমেই অভিকর্ষ বল প্রযুক্ত হয়। এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টের সূর্য যদি হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়, তবে স্থান-কালের বক্রতা মসৃণ হতে থাকবে। কিন্তু এই মসৃণ হবার গতি আলোর বেগের সমান। সুতরাং, পৃথিবীর সূর্যের মহাকর্ষ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে কক্ষচ্যুত হতে সময় লাগবে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডই। অর্থাৎ, সূর্যের হঠাৎ নাই হয়ে যাবার ব্যাপারটা যখন আমরা বুঝবো ঠিক সেই সময়েই পৃথিবীও পুরোপুরি কক্ষচ্যুত হবে। এই প্রস্তাবনাটা নিউটনের মহাকর্ষ বলের তৎক্ষণাত প্রয়োগ (instantaneous assertion) নীতির বিরাট পরিশীলন। আইনষ্টাইন আরো বলছেন মহাবিশ্বে আলোর গতিই কেবল absolute ও সর্বোচ্চ। কোনো পদার্থ কিংবা তথ্য আলোর বেগের চাইতে বেশী বেগে চলতে পারেনা। স্থানিকতার নীতির প্রকাশ আমরা উপরের থট এক্সপেরিমেন্টেও দেখতে পাই। সূর্য হঠাৎ গায়েব হয়ে গেলেও সেটা তৎক্ষণাত পৃথীবিকে প্রভাবিত করবেনা; কেননা, তারা স্থান দ্বারা পৃথককৃত। প্রভাবিত হতে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড লেগে যাবে; কেননা, ততক্ষন সময় লাগে প্রভাবিত করার এজেন্ট (আলো ও স্থান-কালের মসৃণতা) পৃথিবীতে এসে পৌঁছুতে।
ওই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিষয়টা প্রোথিত আছে নিবিড়ভাবে। প্রথমত নিউটনীয় ধারণায় 'সূর্য নাই' হয়ে যাবার সাথে সাথেই পৃথিবী কক্ষচ্যুত হয়ে যাবে কেননা নিউটনীয় ধারণায় মহাকর্ষীয় বলের প্রয়োগ তৎক্ষনাত। আইনস্টাইনের মহাকর্ষের মডেলে স্থান-কালের বক্রতা যেহেতু মহাকর্ষীয় বলে প্রায়োগিক এজেন্ট – তাই 'সূর্য নাই' হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও (সূর্য নাই হয়ে গেলে ধীরে ধীরে সূর্যের অব্যবহিত স্থান-কাল মসৃণ হয়ে যেতে থাকবে – কেননা ভর না থাকলে স্থান-কালের ফেব্রিক মসৃণ থাকে, অর্থাৎ এতে কোনো বক্রতা থাকেনা) স্থান-কালের মসৃণতা ফিরে পাওয়া ঘটবে স্থান-কালে'র উপর দিয়ে প্রবাহিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কালক্রমে ম্রিয়মান হওয়া হিল্লোল সৃষ্টির মাধ্যমে। আর মহাকর্ষীয় এই তরঙ্গ স্থান কালের উপর দিয়ে চলে আলোর বেগের সমান বেগে। তাই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঊর্মিমালা পৃথিবীতে এসে পৌছুতে লেগে যাবে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড – আর তাই ওই সময়টুক পরে পৃথিবী কক্ষচ্যুত হবে।
আইনস্টাইনের তত্ত্বে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গতি আলোর বেগের সমান পাবার কারণেও তিনি ভাবতেন যে মহাকর্ষ আর বিদ্যুত-চুম্বকীয় বল আদতে একই ফ্রেমে বাঁধা – আর এই একীভূত তত্ত্ব পাবার চেষ্টা তিনি করেছেন তাঁর জীবনের শেষ ত্রিশটি বছর।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ মোটামুটি সর্বভেদ্য। স্থান-কালের ফেব্রিকের উপর দিয়ে যেহেতু সব পদার্থ আর শক্তি চলাচল করে তাই এই ফেব্রিক সব কিছুর মধ্যেই নিমজ্জিত। তাই ফলস্বরূপ যখন পোলারাইজড মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আপনার উপর এসে পড়বে তখন একই সাথে আপনার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিচ্যুতি ঘটবে। যেমন ধরুন তরঙ্গের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন প্রসারণ ও সংকোচন যদি হয় ৬ ইঞ্চি তবে যখন এই তরঙ্গ আপনার উপর দিয়ে যাবে তখন তরঙ্গ হিন্দোলের সাথে সাথে আপনার উচ্চতা আর প্রস্থ যুগপদ ৬ ইঞ্চি করে বাড়তে/কমতে থাকবে (Oscillate) তরঙ্গের কম্পাঙ্ক অনুসারে। মজার ব্যাপার বটে!!!
LIGO-তে করা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাবার পরীক্ষা
এবার LIGO-তে করা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাবার পরীক্ষাটি সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত বলা যাক।
![]() |
চিত্র ৫: হ্যানফোর্ড আর লিভিংস্টোন-এ L-আকারের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরূপক যন্ত্র। |
পরীক্ষা যন্ত্রটি আসলে একটা ব্যাতিচার নিরূপক (Interferometer)। এর সমকোণী দু'টি বহু আছে যাদের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার। LIGO ডিটেক্টর স্থাপিত হয়েছে দুটি – প্রথমটি ওয়াশিংটন স্টেট'এর হ্যানফোর্ডে আর দ্বিতীয়টি রয়েছে লুইসিয়ানার লিভিংস্টোন-এ। LIGO মূলত Caltech, MIT-সহ আরো কিছু সহযোগী সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়। এর ফান্ডিং-এ আছে যুক্তরাষ্ট্রের NSF-সহ আরো অনেক দেশের বিজ্ঞান গবেষণার রাষ্ট্রীয় অনুদান দাতারা। এতে নয় শতাধিক বিজ্ঞানী ছাড়াও আছে ৪৪,০০০ স্বেচ্ছাসেবী অন্বেষক, যারা ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং এর সাহায্যে LIGO এর ড্যাটা অনুসন্ধান করে থাকে – মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতি নিরূপন করার জন্যে। তাত্ত্বিক ভাবে LIGO ডিটেক্টর লেজার রশ্মিকে অর্ধস্বচ্ছ আয়না দিয়ে দু'ভাগ করে এর দু'বাহুতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাহুগুলোর বিপরীত প্রান্তে আছে প্রতিফলক আয়না – যা আলোক রশ্মিগুলোকে প্রতিফলিত করে আবার অর্ধস্বচ্ছ আয়নার দিকে ফিরিয়ে আনে। ফিরে আসার পরে দু'বাহুর রশ্মিকে একীভূত করে পাঠিয়ে দেয়া হয় ইন্টারফেরোমিটারে। আর দু'বাহুর দৈর্ঘ্য এমন ভাবে ঠিক করা হয় যাতে ফিরে আসা রশ্মিগুলো ধ্বংসাত্মক দশায় মিলিত হয়।
![]() |
চিত্র ৬: LIGO ইন্টারফেরোমিটার এর ব্লক ডায়াগ্রাম।
|
এখন যখন পোলারাইজড মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এই দু'বাহুর উপর দিয়ে যাবে তখন তাদের একটি বাহু যখন সম্প্রসারিত পোলারাইজেশনে পড়ে তখন অপর বাহু পড়ে সংকুচিত পোলারাইজেশনের দশায়। তাই দু'বাহুতে একে অপরের সাপেক্ষে অতি সামান্য দৈর্ঘ্য বিচ্যুতি দেখা দেয়। আর এই দৈর্ঘ্য বুচ্যুতি তখন ধরা পড়ে ইন্টারফেরোমিটারে বড় সংকেতের আকারে। তবে তাত্ত্বিক ভাবে সহজ হলেও সার্বিক পরীক্ষাটি বেশ আয়াসসাধ্য ও জটিল। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বেশ দুর্বল – তাই কোনো ধরণের অনাকাঙ্খিত নয়েস যাতে পরীক্ষাতে ঋণাত্মক প্রভাব না ফেলে সেজন্যে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সিস্টেমের ঘড়ি ও যন্ত্রপাতিও বেশ সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল। ২০০২ সালে প্রথম চালু হলেও যন্ত্রপাতির সূক্ষ্মতা ঠিক না থাকায় ২০১০ সাল থেকে এর আপগ্রেডের কাজ শুরু হয়। এই আপগ্রেডেড যন্ত্রপাতি দিয়ে LIGO ২০১৫ সালে সেপ্টেম্বর থেকে আবার কাজ শুরু করে। এতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখের একটা মহাকর্ষীয় ইভেন্ট (ইভেন্ট'টির নাম দেয়া হয়েছে GW150914 – মানে, গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ – ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে পাওয়া) দিয়ে ড্যাটা প্রসেসিং শুরু করে। মহাকর্ষীয় ইভেন্টটি ছিল দুটি কৃষ্ণ বিবরের একীভূত হবার ঘটনা। একীভূত হবার আগে এদের ভর ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩৬ (+৫/-৪) ও ২৯ (+৪/-৪) সৌরভর – আর পরে প্রায় ৬২ (+৪/-৪) সৌরভর। প্রায় ৩ (+০.৫/-০.৫) সৌরভরের যে ঘাটতি আছে তা একীভূত হবার পরে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ রূপে বিকিরিত হয়ে যায়। ১.৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের সেই কৃষ্ণ বিবর দু'টির একীভূত হবার ফলে বিকিরিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঊর্মিমালা এসে অবশেষে ধরা পড়ল ওয়াশিংটন আর লুইসিয়ানাতে থাকা দু'টো ডিটেক্টরে।
চিত্র ৭: মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রাপ্তির গ্রাফ। উপরে সময়ের সাপেক্ষে পাওয়া পর্যবেক্ষিত আপেক্ষিক দৈর্ঘ্য বিচ্যুতি – নিচে সময়ের সাপেক্ষে পর্যবেক্ষিত দৈর্ঘ্য বিচ্যুতির কম্পাঙ্কের বিন্যাস।
চিত্র ৮: সময়ের সাপেক্ষে কৃষ্ণ বিবর দুটির কাছাকছি আসা থেকে শুরু হয়ে একীভূত হওয়া ও পরবর্তী আত্তিকরণের গতিপ্রকৃতি।
ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে যে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সংকেতটির ঊর্ধমুখী বিক্ষেপ ৩৫ থেকে ২৫০ হার্টজ যার সর্বোচ্চ মহাকর্ষীয় তারঙ্গিক প্রসারণ ১.০x১০(-২১)। এই পরিমিতি আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্বের আলোকে পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে দুটো কৃষ্ণবিবরের একীভূত হবার প্রাক্কালে উদ্ভুত মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিধৃতির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। GW150914 প্রথমে লিভিংস্টোনে ধরা পড়ে আর তার ৬.৯ মিলিসেকেন্ড পরে ধরা পড়ে হ্যানফোর্ডে। ৬.৯ মিলিসেকেন্ড সময়ের পার্থক্য আলোর বেগে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রগমন লিভিংস্টোন ও হ্যানফোর্ড স্থানিক দূরত্বের পরিমাপক। দুটি আলাদা ডিটেক্টরে একই ধরণের পুনরাবৃত্তি ও সময়ের ব্যবধানের সাথে তরঙ্গের বেগের হিসেব মিলে যাওয়া – GW150914 ইভেন্টের কনফিডেন্স লেভেল বাড়িয়ে দেয়। LIGO টিম প্রকাশ করে যে, তাদের এই হিসেবের ভুল হবার পরিমিতি ২০৩ হাজার বছরে একবার।
চিত্র ৯: চিত্র ৭ ও ৮ এর সমন্বিত চিত্র। এখানে কৃষ্ণ বিবর দুটোর কাছাকাছি আসার আপেক্ষিক গতি ও দূরত্ব দেখানো হয়েছে।
এই চিত্রে দেখা যাচ্ছে যখন কৃষ্ণবিবর দুটো সর্পিলাকারে অবর্তমান (বামে), তারপরে তারা মিলিত হয়ে একীভূত হলো (Merger – ডানে) আর একীভূত হবার পরের আত্তীকরণ (Ringdown – ডানে) । সাথে উপরের গ্রাফের নিচে দেখা যাচ্ছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রসারণের মাত্রা। নিচে কৃষ্ণবিবর দুটো একীভূত হবার প্রাক্কালে তাদের মধ্যকার দুরত্ব ও বেগের গ্রাফ দেখানো হচ্ছে। নিচের ডান দিকে দেখানো হচ্ছে সোয়ার্জচাইল্ড এর ব্যাসার্ধের আলোকে বিবর দুটোর আপেক্ষিক স্থানিক দূরত্ব।
ভবিষ্যত
আইনস্টাইনের প্রস্তাবনার প্রায় ১০০ বছর পরে তার মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে তার করা প্রেডিকশন মিলে যাওয়া এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এই প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ প্রত্যক্ষ ভাবে নিরূপণ করাতে সফল হওয়া জ্যোতির্বিদ্যার জগতে ঘটে যাওয়া এক বিপ্লব। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আলোকে জ্যোতির্বিদ্যার জগতে এক ভিন্ন শাখা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ ছিল এখন পর্যন্ত আমাদের মহাকাশ নিরীক্ষণের একমাত্র সহায়। প্রথম দিকে তা ছিল কেবল দৃশ্যমান আলোর সাহায্যে মহাকাশ দেখা, যেমন দেখেছিলেন গ্যালিলিও কিংবা নিউটন, টেলিস্কোপ দিয়ে – পরে তাতে যুক্ত হয় অব-লোহিত, অতিবেগুনি, এক্স কিংবা গামা রশ্মির মতো অদৃশ্য বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গমালার বর্ণালীও। প্রতিটি আলাদা উপাদান থেকে আমরা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে কিছু আলাদা তথ্য পাই যা ইতোমধ্যে জানা তথ্যের সাথে একীভূত হয়ে আমাদের আরো পরিষ্কার সামগ্রিক চিত্র দেখায়। এখন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আলোকে জ্যোতির্বিদ্যার আগমনে মহাকাশ নিরীক্ষণের সম্পূর্ণ আলাদা একটা পথ আমাদের জন্যে খুলে গেল। আর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ এর চাইতে মৌলিক ভাবে আলাদা হওয়াতে এর সাহায্যে আমরা মহাকাশ সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানতে পারব যা বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের সাহায্যে কোনভাবেই জানা সম্ভব নয়। বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের একটা মৌলিক গুণ হচ্ছে এটা পদার্থের সাথে নানা ভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। যেমন দৃশ্যমান আলোর কথাই ধরুন, আলো যখন কোনো বস্তুর উপর আপতিত হয় তখন এক কিয়দংশ শোষিত হয়, কিছু অংশ হয় প্রতিফলিত, প্রতিসরিত ও বিচ্ছুরিত। আলো আবার কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তের ভেতরের তথ্য আমাদের দিতে পারেনা। এমনকি ঘটনা দিগন্তের বাইরেও আলো স্থান-কালের বক্রতায় চিরন্তন ঘুর্নিপাক খেতে পারে (সূর্যের চারিদিকে গ্রহের আবর্তনের মতো)। কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলো থাকেনা। পদার্থের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া কম, কিংবা নিদেনপক্ষে আলাদা। আলো যেমন অনেক প্রতিবন্ধকতা ভেদ করতে পারেনা – সেক্ষেত্রে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বলতে গেলে সর্বভেদ্য – অর্থাৎ এটি সব কিছুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। অবশ্য প্রবাহিত হবার সময় পদার্থের দৈর্ঘ্যকে সে প্রসারিত কিংবা সংকুচিত করে। কিন্তু এর সর্বভেদ্যতার ধর্ম একে বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের সাপেক্ষে এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে আসে। অর্থাৎ মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছুই জানতে পারবো যা বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে জানা সম্ভব নয়।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে কৃষ্ণ বিবরের ঘটনা দিগন্তের মধ্যকার বিষয়াদিও জানা হয়ত সম্ভবপর হবে। আরো হয়ত জানা যাবে বিগ ব্যাং ও এর অব্যবহিত পরের মহাবিশ্বের চিত্রপট। আলোক তরঙ্গের সাহায্যে আমরা মহাবিশ্বের জন্মের ৩৮০ হাজার বছরের পরের ঘটনাগুলো জানতে পারি। ইলেক্ট্রন আর প্রোটনের সম্মিলনে অণু তৈরী হওয়া শুরু করে বিগ ব্যাং এর ৩৮০ হাজার বছর পরে। আমরা বর্তমান বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক টেলিস্কোপ দিয়ে ওই সময়টুকু পর্যন্ত মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে দেখতে ও জানতে পারি। ওই সময়ের আগে মহাবিশ্ব ছিল ইলেক্ট্রন, প্রোটন আর ফোটনের মিশ্রিত প্লাজমার মতো – তাই বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক টেলিস্কোপ এর কাছে তা ঝাপসা কিংবা অস্বচ্ছ। কিন্ত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক জ্যোতির্বিদ্যায় সেই সীমাবদ্ধতাটুকু থাকছেনা। পরন্তু বিগ ব্যাং এর পরে মহাকর্ষীয় বল ছিল সবচাইতে প্রবল – বিকর্ষী মহাকর্ষীয় বল শুরুতেই মহাবিশ্বের অস্বাভাবিক স্ফীতির জন্যে দায়ী বলে ধরা হয়। তা অবশ্যই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ভিত্তিক জ্যোতির্বিদ্যার এই নতুন শাখা আমাদের সময়ের সাপেক্ষে আরো অনেক পেছনে দেখতে সাহায্য করবে। তাত্ত্বিক ভাবে বলা যায় যে, প্রায় বিগ ব্যাং এর পরের মুহূর্তটুকু সম্পর্কেও আমরা জানতে পারব এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ-ভিত্তিক জ্যোতির্বিদ্যায়।
এই লক্ষ্যে ESA (European Space Agency) আর জাপান এগিয়েও চলছে। ESA, eLISA (Evolved Laser Interferometer Space Antenna) নামের লেজার ভিত্তিক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরূপক মহাকাশে পাঠাবার লক্ষ্যে কাজ করছে। eLISA হচ্ছে মহাকাশে স্থাপিতব্য একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুসন্ধক যেখানে তিনটি আলাদা মহাকাশ প্রোব একসাথে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিরূপক হিসেবে কাজ করবে। এই লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে LISA Pathfinder নামের একটি মিশন ইতোমধ্যে মহাকাশে পাঠিয়েছে ESA। এটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অনুসন্ধান করবেনা – বরং তার পরবর্তিতে মূল eLISA মিশনের জন্যে প্রয়োজনীয় অনেক প্রযুক্তিগত চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে।
চিত্র ১০: eLISA সমাবেশ (Constellation) এর প্রস্তাবিত চিত্র। এটি লেজার-ভিত্তিক ইন্টারফেরোমিটার যা পৃথিবীর কক্ষে স্থাপিত হবে বলে প্রস্তাবিত।
সব কিছু ঠিক থাকলে eLISA সমাবেশ ২০৩৪ সালে মহাকাশে উৎক্ষিপ্ত হবে। সমাবেশ এর তিনটি প্রোব সমবাহু ত্রিভুজের আকারে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে সাজানো হবে। সামগ্রিক ভাবে সমাবেশ সিস্টেম চাঁদের কক্ষ থেকে ১০ গুন দূরে অবস্থিত হবে। তাই পৃথিবীর সাপেক্ষে প্রোবগুলো স্থির অবস্থানে থাকবে। সমবাহু ত্রিভুজের প্রতিটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক কোটি কিমি। আর এটিও LIGO এর মতো লেজার ইন্টারফেরোমিটার হিসেবে কাজ করবে। তবে প্রস্তাবিত অঞ্চলে পৃথিবী আর সূর্যের উভয়ের মহাকর্ষিক প্রভাব একে অপরকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে দেয় বলে ব্যাকগ্রাউন্ডে পৃথিবী ও সূর্যের প্রভাবে তৈরী মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাব এতে কম থাকবে – আর তাই এটি দিয়ে মহাকাশের নানা অঞ্চল থেকে আসা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সুনিপুনভাবে মেপে দেখা যাবে। এর সামগ্রিক সূক্ষ্মতা পার্থিব নিরূপকদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি হবে।
আশা করা যায় তখন চোখ দিয়ে (বিদ্যুত-চুম্বকীয় তরঙ্গ) মহাকাশ দেখার পাশাপাশি কান দিয়েও (মহাকর্ষীয় তরঙ্গ) মহাকাশকে শোনা ও বোঝা যাবে। এতে করে মহাবিশ্বের অনেক অজানা রহস্য হয়ত মানব জাতির সামনে উন্মোচিত হবে।












0 Comments
Post a Comment