বর্ণমালাতেই লেখাপড়ার বিষয়টি চুকিয়ে নিয়ে একধরনের অগস্ত্যযাত্রার যাত্রী হয়েছেন বাবু সাহেব। উনাকে হ্যাচাকের আলোতেও এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকটা বসন্তের কোকিলের মত। ঢাকার বড় কোন পোশাকশিল্পে ছোট থেকে খেটে খেটে আজ একটা শক্তপক্ত স্থান হয়েছে উনার। শুধু কি তাই! এখন তো ইংলিশ উনার ঝোলায় পুরা থাকে। যেন আবাদি জমির মত। দুই চার কথার পরপরেই ইংলিশ বের হয়ে আসে। এটা যেন উনার একটা একস্ট্রা ক্যাডিট। বড় অট্টালিকা করেছেন। ধনের কমতি নেই। এককথায় বাবু সাহেব এখন এলাকার ধন কুবেরদের নামের তালিকায় একটা সন্তোষজনক স্থান করে নিয়েছেন। বাবু সাহেবের সম্পর্কে লোকমূখে কত কি না শুনেছি। ভালোও শুনেছি। মন্দও শুনেছি। কিন্তু সাহেবের আচরণবিধিকে প্রত্যেক্ষ করবার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
...সেদিন আচমকা!
চোখের সামনে বাবু সাহেব; অগ্নিশর্মা চেহারায় ব্যাঘ্রকন্ঠে মমিনুল কে উদ্দেশ্য করে বললেন-
'হোয়াই য়িঅর মিসটেক(Why your misstake)? '
মমিনুল আর জবাব করবার ভাষা পেলনা। সে হতবম্ভ হয়ে শুকিয়ে গেল। মমিনুল আমার বন্ধু। বেলাল, আপেল, সিরাজুল, মমিনুল আর আমি মিলে পাঁচ(০৫) বন্ধু আড্ডা দিচ্ছিলাম। আড্ডা হচ্ছিলো বোর্জের বাজারে নজরুল ভাইয়ের ফার্মেসীতে। অনেক হাসাহাসি, আনন্দে আড্ডাটা জমেছিল। কিন্তু এই জমানোটা সামান্য সময়েই নৎস্যাত হয়ে গেল। সবার মুখ কালো হয়ে উঠলো সাথে বুকও। তখন সন্ধ্যা নামছিল মাত্র। বাজারে মানুষের সমাগম ক্রমেই বৃদ্ধি হচ্ছিলো। হঠাৎ অমাবস্যার চাঁদের মত বাবু সাহেবের আগমন। এসেই হাতের টর্চ-লাইট ডেক্সে রাখলেন সাথে নজরুল ভাইয়ের কাছে ব্যথার টেবলেট চাইলেন।
...একটুপরেই খরিদ্দারদের ভিড় জমবে ফার্মেসীতে। তাই সবাই মিলে এলাকার নতুন স্লুইচগেট দেখতে যাব কথা হলো। এক এক করে রুম থেকে বেলাল, আপেল, সিরাজুল, মমিনুল সবাই বেরুলো। এবার আমার পালা। আল্লার কি কাজ বেরুতেই সাহেবের টর্চ-লাইট ঠাস করে নিচে পড়ে গেল। এই শব্দেই অন্যদিকের দৃষ্টি ফিরায় নিয়ে সাহেব ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন। আমি ততক্ষণে আবার রুমে ঢুকে পরেছিলাম।
সাহেব মমিনুল কে সন্দেহ করে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন-
এটা কি হলো?
মমিনুল জবাব করলো 'ইটস মিসটেক' আঙ্কেল।
সাহেব এবার পূর্বেল্লেখিত অগ্নিশর্মা চেহারায় ব্যাঘ্র কণ্ঠে বললেন-
'হোয়াই য়িঅর মিসটেক(Why your misstake)?'
এভাবে একের পর এক সাত-পাঁচ যা পাচ্ছেন বলছেন। সবাই হতবম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। খোদ নজরুল ভাইও। ঘটনা বেসামাল বুঝে আমি নম্র করে বললাম দেন আমি মন্টু ম্যাকারের থেকে সেরে নিয়ে আসছি। এইবার বেচারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। পূর্বাপেক্ষা জোড়ালো এবং রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন-
কিসের মন্টু-ঝন্টু.....
পরের অংশটুকু বলেনি কিন্তু আমরা বুঝেছি যে,
ঐ টর্চ-লাইটই কিনে দেবার বৈ অন্য কোন পথ খোলা নেই।
...এবার বাবু সাহেব পকেটের সিগারেটে আগুন ধরালেন। তারপর তা ঠোঁটে নিয়ে শো.... শো....
শব্দে কয়েকটা টান মারলেন। পরে দূরে গিয়ে ঝিমমেরে বসে থাকলেন। এদিকে আমরা অবিকল না পেলেও প্রায় অবিকল কপি একটা টর্চ-লাইট নিয়ে সাহেবের কাছে পৌঁছলাম। সিরাজুল ভীত কণ্ঠে নম্র সুরে বললো-
আঙ্কেল অবিকল কপি না পেলেও এই টর্চে কোন কমতি নেই। এটা নেন রাতে বাসা যেতে অন্তত রাস্তাঘাট চলা সহজ হবে। ততক্ষণে, সাহেবকে হয়ত সিগারেটের নিকোটিন কিছুটা শান্ত করেছিল। তাই বুঝলাম একটু কম রাগেই বললেন-
আমি কি তা চেয়েছি। আল্লাহ আমাকে অনেক ধন দিয়েছে। কোন কিছুর কমতি নেই। আমি কেবল তোমাদের শিক্ষা দিবার জন্য এমনটা করেছি।
তখন বেলালের সহিত আমরাও বললাম আঙ্কেল এমনটা না করলেও বোধয় পারতেন। যাহোক, অসাবধানতার কারনে এমনটা হয়েছ। তো আমরা বিষয়টার জন্য অনুতপ্ত এবং সরি(Sorry)।
...সেদিন এমন অগ্নিপরীক্ষার মধ্যদিয়ে আমরা
চির সত্যটুকু আরো একবার বুঝলাম যে,
'অর্থ কেবলি অন্ধ বানায় আর শিক্ষায় মানবতার মুক্তি মেলে।'
0 Comments
Post a Comment