[লেখাটি আমার পদার্থবিদ্যার
অমিমাংসিত সমস্যা সিরিজের পরবর্তী
অধ্যায়। এই সিরিজে ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ হবার
প্রধানতম দাবীদার ‘স্ট্রিং তত্ত্বের’
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সহ আনুষঙ্গিক ব্যাখ্যা/
বিশ্লেষণ থাকবে।]

প্রাথমিক আলোচনা

১. ভেনেজিয়ানো সার্ণে বসে সবল
নিউক্লীয় বলের বিধৃতি পর্যবেক্ষণ করে
দেখতে পেলেন যে একে ইউলারের বিটা
ফাংশনের মাধ্যমে প্রকাশ করা যাচ্ছে।
কিন্তু কেন যাচ্ছে তার ব্যাখ্যা তিনি
দিতে পারলেন না।
২. লিওনার্দ সাস্কিন্ড বললেন, যে
নিউক্লীয়াসের মধ্যে নিউক্লীয়ন গুলো তন্তু
সদৃশ সত্ত্বা দিয়ে সংযুক্ত তা-ই স্ট্রিং বা
তারের কম্পন প্রকৃতির সমীকরণ ইউলারের
বিটা ফাংশনের মাধ্যমে সবল বলের
ইন্টারঅ্যাকশন ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে।
৩. পরে কোয়ার্কের আদলে আসা নতুন সবল
বলের ব্যাখ্যা দিতে পারলোনা
সাস্কিন্ডের সাজানো স্ট্রিং তত্ত্ব।
ভাবা হচ্ছিল এখানেই বুঝি স্ট্রিং তত্ত্ব
অকালে অক্কা পেল। কিন্তু কিছুকাল পরেই
সোয়ার্জের একাগ্র প্রচেষ্টায় তা জেগে
উঠলো সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে – আরো ব্যাপক
ব্যাপ্তি নিয়ে।
সোয়ার্জের একাগ্রতা

সবল নিউক্লীয় ইন্টারঅ্যাকশন এর পুরো
পরিধি যদিও স্ট্রিং তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে
পারলোনা, তারপরেও জন সোয়ার্জ বলতে
গেলে একরকম একগুঁয়ের মতোই লেগে রইলেন
এর পেছেনে। তার অগাধ বিশ্বাস ছিল যে
এই অসম্ভব সুন্দর গাণিতিক সমীকরণগুলোর
অন্য কোনো ব্যাখ্যা বা পরিচিতি অবশ্যই
আছে। এমনটা বিশ্বাসের কারণও ছিল। সবল
নিউক্লীয় বলের বিধৃতি দেয়া স্ট্রিং
তত্ত্বের কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল
সমীকরণগুলো উচ্চ-শক্তির এ্যটম স্ম্যাশারে
একটা নতুন ও অদ্ভুত ধরণের কণার
ভবিষ্যতবাণী করছিল। ভবিষ্যতবাণী করা
কণাটির ভর হবে শূণ্য কিন্তু স্পিন হবে দুই।
কোনো পরীক্ষাগারেই এমন কণা পাবার
কথা শোনা যায়নি। সোয়ার্জ আর শের্ক
ভাবতে লাগলেন ভরশূণ্য ও স্পিন দুই এর কণা
কোনটি? তাই প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল যে
সমীকরণের প্রেডিকশনই বুঝি ভুল।
প্রাকৃতিক বলগুলোকে চিরায়ত
ক্ষেত্রতত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা
হয়েছে অনেক কাল ধরেই। যেমন ভারী
পদার্থ একে অপরকে আকর্ষণ করে, যার
প্রকাশ হয়েছে নিউটনের মহাকর্ষ সুত্রে
কিংবা পরবর্তীতে আইনষ্টাইনের সাধারণ
আপেক্ষিকতার তত্ত্বে । একইভাবে সম
আধানের কণাগুলো পরষ্পরকে বিকর্ষণ করে
কিন্তু বিপরীত আধাণের কণা করে আকর্ষণ
– বিদ্যুত/তড়িৎ বলের এই ব্যাখ্যা ও প্রকাশ
দেন কুলম্ব, যা চিরায়ত ক্ষেত্রতত্ত্বের
(classical field theory) উপর স্থাপিত। সাধারণ
ক্ষেত্রতত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত আকর্ষী ও
বিকর্ষী বলগুলোর সঠিক পরিমিতি আমরা
সমীকরণগুলো থেকে নিখুঁত ভাবে বলে
দিতে পারি। ক্ষেত্র তত্ত্ব যে ব্যাখ্যাটা
ভালোভাবে দিতে পারেনা তা হলো –
কেন বিপরীত আধান আকর্ষণ ও সম আধান
পরষ্পরকে বিকর্ষণ করে। এটা আসলেই একটা
মৌলিক ও স্বাভাবিক প্রশ্ন। ইলেকট্রন
নিজ থেকেই কীভাবে জানে যে অন্য
ইলেকট্রনকে বিকর্ষণ করতে হবে, আর
প্রোটোন হলে করতে হবে আকর্ষণ। এই
সমস্যাটির সমাধানকল্পে আসে কোয়ান্টাম
ক্ষেত্রতত্ত্ব (quantum field theory)।
কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বে মধ্যস্থতাকারী
কণার (messenger particle) বিনিময়ের
মাধ্যমে আলোচ্য বলটি প্রযুক্ত হয় বলে বলা
হয়।
                          চিত্র ১: স্ট্যান্ডার্ড মডেলে থাকা মৌলিক
                         কণাগুলোর চার্ট।

উদাহরণ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড মডেলে
থাকা গেজ বোসন গুলোর দিকে তাকানো
যাক। এগুলো কিন্তু আমাদের জানা মৌলিক
বলগুলোকে বহনকারী ম্যাসেঞ্জার বা
মেডিয়েটিং কণা বা বলবাহী কণা। যেমন,
ফোটোন হচ্ছে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক
বলের ম্যাসেঞ্জার কণা। তেমনিভাবে
গ্লুয়ন হচ্ছে সবল নিউক্লীয় বলের ও W ও Z
বোসন হচ্ছে দূর্বল বলের ম্যাসেঞ্জার
কণা।স্ট্যান্ডার্ড মডেলে থাকা তিনটি
মৌলিক বলের ম্যাসেঞ্জার কণার
উপস্থিতি পরীক্ষাগারে পাওয়া গেছে।
মৌলিক চতুর্থ বলটি হচ্ছে মহাকর্ষ বা
গ্র্যাভিটি। এর ক্ষেত্রতাত্ত্বিক ভিত্তি
দেন প্রথমে নিউটন ও পরে আইনষ্টাইন।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে গ্র্যাভিটির
কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্যাল রূপ এখনো রয়ে
গেছে তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবেই। অর্থাৎ
কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব কি আসলেই
মহাকর্ষের জন্যে প্রযোজ্য – এই প্রশ্নটির
সমধান তখনো হয়নি – এমনকি এখনো হয়নি।
আদতে গ্রাভিটিকে বাকী বলগুলোর সাথে
একীভুত করার সার্বিক তত্ত্বই হচ্ছে
‘ সবকিছুর তত্ত্ব’। তবে গ্র্যাভিটি বা
মহাকর্ষকে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বের
আওতায় আনার সব প্রয়াসেই যে নির্দিষ্ট
ফলাফল সবসময় পাওয়া গেছে তা হচ্ছে –
গ্র্যাভিটির প্রস্তাবিত কোয়ান্টাম
মেকানিক্যাল কণা গ্র্যাভিটন ভরশূণ্য ও এর
স্পিন দুই। সোয়ার্জ ও শের্ক এর মাথায় এই
বাস্তবতাই এসে ধরা দিল ‘ইউরেকা’ মুহুর্ত
হিসেবে। তারা স্বগত ভাবেই ভেবে
নিলেন স্ট্রিং তত্ত্বের সমীকরণে
ভবিষ্যতবাণী করা কণাটি আসলে
গ্র্যাভিটন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই
শোয়ার্জ আর শের্ক বললেন, স্ট্রিং তত্ত্ব
আসলে প্রথমে ভেনেজিয়ানো ও
সাস্কিন্ডের প্রস্তাবিত সবল নিউক্লীয়
বলের তত্ত্ব নয়। এটা আরো ব্যপক। তারা
বললেন, স্ট্রিং তত্ত্ব আসলে সব মৌলিক
বলকে এক গাঁথুনিতে বাঁধার এক সার্বিক
তত্ত্ব – অর্থাৎ ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ (Theory of
Everything)।

                           চিত্র ২: জন সোয়ার্জ। স্ট্রিং তত্ত্বের
                          প্রাথমিক ব্যার্থতার পরেও জন সোয়ার্জের
                          অক্লান্ত পরিশ্রমে তা আবার নতুন আলো
                          দেখে – তবে এবার সবল নিউক্লীয় বলের
                         চেয়েও আরো ব্যপক আঙ্গিকে – সবকিছুর
                         তত্ত্ব হিসেবে।

সবকিছুর তত্ত্ব কী?

এই সিরিজের মূল আলোচ্য বিষয়ের দিকে
আলোকপাত করা যাক এখন। জানার চেষ্টা
করা যাক ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ আসলে কী?
নিচের ছবিটি দেখা যাক। এখানে ডান
দিকে মৌলিক চারটি বলের একীভুতকরণের
রেখাচিত্র দেয়া আছে। আপাতত আমরা
কেবল ডান দিকের force carrier অংশে
মনোযোগ দেব।
১. প্রথমে দ্বিতীয় সারিতে আছে মৌলিক
চারটি বলের নাম – যথাক্রমে সবল
নিউক্লীয় বল (Strong Nuclear Force), দূর্বল
নিউক্লীয় বল (Weak Nuclear Force), বিদ্যুত-
চৌম্বকীয় বল (Electromagnetic force) ও
মহাকর্ষ (Gravitational Force).
২. এর মধ্যে বিদ্যুত-চৌম্বকীয় বলও এক সময়
আলাদা আলাদা বিদ্যুত ও চুম্বক বল
হিসেবে পরিচিত ছিল। অনেক বিজ্ঞানীই
বিদ্যুত ও চুম্বক বল যে সম্পর্কিত তা অনুধাবন
করতে সক্ষম হন। ফ্যারাডে , গ্যাল্ভানি ,
লরেন্টজ সহ অনেকেই বিদ্যুত আর চুম্বকীয় বল
যে সম্পর্কিত তা বুঝতে পারেন – কিন্তু
জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলই প্রথম একসেট
সমীকরণের মাধ্যমে এই দুটো বলকে একীভুত
করেন।
৩. ঐদিকে প্রায় একই সময়ে মাইকেলসন-
মর্লি পরীক্ষা করে দেখেন যে আলোর বেগ
ধ্রুব ও তা পর্যবেক্ষকের গতি ও অবস্থানের
উপর নির্ভর করছেনা। ম্যাক্সওয়েল এর
সমীকরণেও দেখা যাচ্ছে শূণ্য মাধ্যমে
বিদ্যুত-চৌম্বকীয় শক্তির বেগ ধ্রুব ও তা
আলোর বেগের সমান। তখন থেকে বিদ্যুত-
চৌম্বকীয় বলের প্রকৃতি অনেক খোলাসা
হলো। যেমন, এটা বোঝা গেলে বিদ্যুত-
চৌম্বকীয় বলের একটা অংশ হচ্ছে আলো –
আর তার বেগ ধ্রুব। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ
এটাও পরিষ্কার করলো যে বিদ্যুৎ ও চুম্বক
আসলে আলাদা বল নয়, বরং একই বলের
ভিন্ন প্রকাশ। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলই
তাই প্রাকৃতিক বলগুলোকে একই
ফ্রেমওয়ার্কে বাঁধার প্রথম কাজটি করেন।
৪. মৌলিক চারটি বলের বলবাহী কণা হচ্ছে
গ্লুয়ন, W ও Z বোসন, ফোটোন ও গ্র্যাভিটন-
যা চিত্রের প্রথম সারিতে দেখানো
হয়েছে। উপরে আলোচিত বিদ্যুত-চৌম্বকীয়
বলের বলবাহী কণা হচ্ছে ফোটোন, যা
ভরশূণ্য।
৫. দূর্বল নিউক্লীয় বলের ফলে ঘটে থাকে
তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ (radioactivity), যার
ফলে ভারী তেজষ্ক্রিয় মৌল হাল্কা ও
সুস্থিত মৌলে রূপান্তরিত হয়। তেজষ্ক্রিয়
বিকিরণের জন্যেই ঘটে আলফা, বিটা ও
গামা বিকিরণ, যার উৎস হচ্ছে
নিউক্লীয়াস। ষাটের দশকে প্রফেসর আব্দুস
সালাম, শ্যাল্ডন গ্ল্যাশো ও স্টিভেন
ওয়াইনবার্গ দেখাতে সক্ষম হন যে বিদ্যুত-
চৌম্বকীয় বল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল আসলে
একই উৎসে শুরু হয়েছে। বিগ ব্যাংয়ের পরে
যখনো মৌলিক কণাগুলো ভরবাহী হয়নি –
তখন বিদ্যুত-চৌম্বকীয় বল ও দুর্বল নিউক্লীয়
বল একই বল হিসেবে মহাবিশ্বে অবস্থান
করছিল। সিমিট্রি বা প্রতিসমতা ভেঙ্গে
বলগুলো আলাদা রূপ বা আদল পায়। এই
বিষয়ে আমার আগের লেখা থেকে কিয়দংশ
তুলে দিলাম- 
প্রফেসর সালাম, পিটার হিগসের দেখানো
মডেল অনুসারে এগিয়ে দেখালেন যে
বিগব্যাং-য়ের অব্যবহিত পরে যখন সমগ্র
মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ছিল অসম্ভব রকম
বেশী তখন এই অত্যধিক তাপমাত্রার জন্যে
হিগস ফিল্ড তৈরী হয়নি। আর সেজন্যে তখন
তড়িৎ-চুম্বকীয় বল আর দূর্বল-নিউক্লীয় বল
একই বলরূপে মহাবিশ্বে অবস্থান করছিলো।
তাই ওই সময় তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের
ম্যাসেঞ্জার কণা ফোটন আর দূর্বল
নিউক্লীয় বলের প্রস্তাবিত ম্যাসেঞ্জার
কণা W এবং Z বোসনের কোনো ভর
ছিলোনা, সেজন্যে তারা একই
ফ্রেমওয়ার্কে একীভুত ছিল। তবে
মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কমে আসাতে
তৈরী হলো হিগস ফিল্ড, আর হিগস
ফিল্ডের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন করে
সিমিট্রি ব্রেকিংয়ের মাধ্যমে W এবং Z
বোসন পেল সীমিত ভর। প্রফেসর সালাম
যখন এই সাহসী প্রস্তাবনা নিয়ে চিন্তা
করলেন, তখনো পিটার হিগসের সিমিট্রি
ব্রেকিংয়ের তত্ত্বই প্রমাণিত হয়নি; আর
তখনো পাওয়া যায়নি ‘হিগস বোসন।’ কিন্তু
প্রফেসর সালাম নিজের করা মডেলে
ছিলেন অসম্ভব বিশ্বাসী। তাই তিনি
ওয়াইনবার্গ আর গ্ল্যাশোর সাথে যুগপদ
ভাবে প্রস্তাব করলেন প্রায় ১০০ বছর আগে
ম্যাক্সওয়েলের করা প্রাকৃতিক বলের
সমন্বয়ের দ্বিতীয় ধাপ। বলার অপেক্ষা
রাখেনা, সালাম, ওয়ানবার্গ আর
গ্ল্যাশোর প্রস্তাবিত W এবং Z বোসন
পাওয়া গেল পরীক্ষাগারে আর প্রমাণিত
হলো ইলেক্ট্রোউইক ফোর্সের তত্ত্ব; আর
সেজন্যে এই ত্রয়ী পদার্থবিদ্যায় নোবেল
পেলেন ১৯৭৯ সালে।
৬. সালাম, গ্ল্যাশো ও ওয়াইনবার্গের
একীভুতকরণের ফলে ম্যাক্সওয়েলের প্রায়
১০০ বছর পরে মৌলিক ৪টি প্রাকৃতিক বলের
দুটিকে একই ফেওমওয়ার্কে বাঁধা গেলো।
এরপরে একীভূত হতে বাকী থাকলো আরো
দুটি বল- অর্থাৎ, সবল নিউক্লীয় বল আর
মহাকর্ষ ।
৭. সবল বলের সাথে ইলেক্ট্রোউইক ফোর্সের
সমন্বয়ের তত্ত্বকে বলা হয় বৃহৎ-একীভূত
তত্ত্ব (grand unified theory বা GUT)। এই তত্ত্ব
নিয়ে কাজ চলছে অনেক দিন ধরে। কিন্তু
গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যায়নি এখনো।

                চিত্র ৩: প্রাকৃতিক বল ও ভরবাহী কণাদের
                চার্ট। ডানে আছে চারটি মৌলিক বলের
                একীভূত হবার পর্যায়ক্রমিক রেখাচিত্র।
                যেমন দূর্বল ও বিদ্যুত-চুম্বকীয় বলের সমন্বয়ে
                তৈরি হয় ইলেক্ট্রোউইক বলের তত্ত্ব।
                ইলেক্ট্রোউইক তত্ত্বের সাথে সবল বল যুক্ত
                করার তত্ত্বকে বলা হয় বৃহৎ একীভূত তত্ত্ব
                (Grand Gnified Theory)। সবশেষে বৃহৎ একীভূত
                তত্ত্বকে মহাকর্ষ বা গ্রাভিটির সাথে
               সমন্বিত করার তত্ত্বকে বলা হচ্ছে সবকিছুর
                তত্ত্ব (Theory of Everything)। গ্রহণযোগ্য ও
                প্রমাণিত বৃহৎ একীভূত তত্ত্ব (GUT) ও
                সবকিছুর তত্ত্ব (Theory of Everuthing) এখনো
                পাওয়া যায়নি। তবে স্ট্রিং তত্ত্বের
                আঙ্গিকে এই সব বলকে একই ফ্রেমওয়ার্কে
                অন্তত গাণিতিক ভাবে বাঁধা যায়। এটাই
                স্ট্রিং তত্ত্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দিক।

৮. বৃহৎ-একীভূত তত্ত্ব (GUT) এর সাথে
মহাকর্ষের মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে।
বৃহৎ একীভূত তত্ত্বে (কিংবা সংক্ষেপে
GUT) থাকা বল আর এর কণাগুলোর প্রমাণ
আলাদা আলাদা ভাবে পাওয়া গেছে।
গ্লুয়ন সহ ফোটোন ও W ও Z বোসন কণার
বিনিময় দ্বারা GUT এর বলগুলো যে
প্রকাশমান তা পরীক্ষাগারে প্রমাণিত
হয়েছে ইতোমধ্যে। আর GUT কিংবা বৃহৎ
একীভূত তত্ত্বের বলগুলো সব পরমাণু
ভিত্তিক, যেমন বিদ্যুত প্রবাহ আসে
পরমাণুর বাইরে থাকা ইলেক্ট্রনের প্রবাহ
থেকে, আর সবল ও দূর্বল বলের প্রকাশ থাকে
পরমাণুর কেন্দ্রে থাকা নিউক্লীয়ন গুলোর
মিথষ্ক্রিয়া থেকে। মহাকর্ষ কিংবা
গ্র্যাভিটি কিন্তু GUT কিংবা বৃহৎ একীভূত
তত্ত্বে থাকা বলগুলো থেকে বেশ আলাদা।
প্রথমত, গ্র্যাভিটি পরমাণু কেন্দ্রিক বল নয়
বরং ভরের সাথে সম্পর্কিত বল। অবশ্য
পরমাণু থেকেই সকল ভরের উৎপত্তি (অদীপ্ত
পদার্থ বা ডার্ক ম্যাটার বাদ দিলে)
এভাবে ভাবলে একেও অবশ্য পরমাণুর সাথে
সম্পর্কিত বলে ভাবা যায়।
গ্র্যাভিটনের কথা বললে বলা যায় এটা
কেবল তাত্ত্বিক ভাবেই আছে –
পরীক্ষাগারে কখনো এর অস্তিত্ব পাওয়া
যায়নি। সে অর্থেও গ্র্যাভিটি GUT থেকে
আলাদা। আরেকটা ব্যপার হচ্ছে গ্র্যাভিটি
স্ট্যান্ডার্ড মডেলে নেই (দেখুন উপরের
স্ট্যান্ডার্ড মডেলের চিত্র)। GUT এর
ফ্রেমওয়ার্কে মৌলিক ৩টি বলকে একীভূত
করার মডেল। অবশ্য এতে আছে ভরের রহস্য
উন্মোচনকারী হিগস ফিল্ড ও হিগস বোসন –
যেটা এখনো নিশ্চয়তার সাথে আবিষ্কৃত
হয়েছে বলা যায় না (১ , ২ , ৩, ৪, ৫)।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে – GUT-এ থাকা ৩টি
বলের পরিমিতি গ্র্যাভিটির চাইতে অনেক
অনেক গুণ বড়। গ্র্যাভিটি অসম্ভব রকমের
দূর্বল বল – তাই সমগ্র পৃথিবী যেখানে একটা
চাবির গোছাকে টেনে রাখতে চায় তাকে
সমজেই অতিক্রম করতে পারে ছোটোখাট
একটা দন্ড চুম্বক। যাইহোক, যা বলতে
চাচ্ছিলাম তা হচ্ছে গ্র্যাভিটির সাথে
বাকী ৩-টা মৌলিক বলের কিছুটা পার্থক্য
আছে নানা দৃষ্টিকোণ থেকেই – আর
সেভাবে পদার্থবিদরাই সব বলগুলোকে
একীভূত করার সমস্যাকে ভাগ করে
নিয়েছেন। অনেকে আছেন GUT জাতীয় বৃহৎ
একীভূত তত্ত্বের সন্ধানে আর অনেকেই
আছেন কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি কিংবা
স্ট্রিং তত্ত্ব নামক ‘সবকিছুর তত্ত্বে’র
সন্ধানে।
৯. পাঠকের নিশ্চয়ই এর মধ্যে বুঝে গেছেন
যে – ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ হচ্ছে ‘বৃহৎ একীভূত
তত্ত্বে’র সাথে মহাকর্ষকে একীভূত করার
তত্ত্ব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে GUT লেভেলেই
কোনো ভালো একীভুত করণের তত্ত্ব নেই –
স্বভাবতই এটা ভাবা স্বাভাবিক যে GUT এর
গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব প্রথমে আসুক তারপরে না
হয় ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ খোঁজা যাবে।
১০. স্ট্রিং তত্ত্ব কিন্তু আসলেই ‘সবকিছুর
তত্ত্ব’ – সে অর্থে এতে আছে GUT
লেভেলের একীভূত করণের প্রস্তাব, আরো
আছে GUT এর সাথে গ্র্যাভিটির সমন্বয়ের
সমীকরণগুলোও – যা স্ট্রিং তত্ত্বকে
বানিয়েছে ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ হবার শক্ত
প্রতিদ্বন্দ্বী।
সোয়ার্জ আদতে এটাই দেখাতে চাইলেন –
অর্থাৎ যেহেতু স্ট্রিং তত্ত্বে ভরহীন ও
স্পিন দুই এর কণা পাবার ভবিষ্যতবাণী করে
তাই স্ট্রিং তত্ত্ব আসলে গ্র্যাভিটনের
প্রকাশমান তত্ত্ব অর্থাৎ ‘সবকিছুর তত্ত্ব’।

সূত্র:

1. The Fabric of the Cosmos: Space, Time, and
the Texture of Reality, by Brian Greene, – Knopf
Doubleday Publishing Group- 2005- Paperback-
592 pages- ISBN 0375727205
2. The Elegant Universe: Superstrings, Hidden
Dimensions, and the Quest for the Ultimate
Theory, By Brian Greene- Knopf Doubleday
Publishing Group- 2000- Paperback- 464 pages-
ISBN 0375708111


আমি আনু
যোগাযোগ: anukgc@gmail.com