রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার অন্তর্গত ইটাকুমারী শিবচন্দ্র রায় জমিদারবাড়ী ১৭৮৩ সালের প্রজাবিদ্রোহের সূচনা কেন্দ্র। কালের পরিক্রমায়, উপেক্ষা অবহেলায় আজ বিলুপ্ত প্রায় এই অমূল্য নিদর্শন। অথচ, এর সাথে জড়িয়ে আছে ভারতবর্ষের এক গৌরবময় ইতিহাস। তৎকালীন ভারতবর্ষে বৃটিশ বিরোধী প্রজাবিদ্রোহ শুরু হয়েছিল এই জমিদারবাড়ী থেকে। বৃটিশ ইজারাদার অত্যাচারী 'দেবী সিং' অন্যায় ভাবে প্রজাদের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে, তখন রাজা শিবচন্দ্র রায় দেবী সিং এর কাছে অতিরিক্ত কর তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন, কিন্তু দেবী সিং পাল্টা শিবচন্দ্র রায়কে রংপুরের লালকুঠিতে বন্ধি করে রাখেন। পরে জমিদার রানী মুক্তিপণের বিনিময় শিবচন্দ্র রায়কে মুক্ত করে আনেন। রাজা শিবচন্দ্র রায় ফিরে এসে সকল জমিদারগণ কে রাজ্য সভায় আমন্ত্রন করেন। ফতেহপুর পরগনার(ইটাকুমারী) জমিদারবাড়ীতে কাকিনা, মধুপুর, ভাইয়ের হাট, মন্থনা সহ বেশ কিছু রাজ্যের জমিদারগণ উপস্থিত ছিলেন। উক্ত বৈঠকে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়। অবশেষে রাজা শিবচন্দ্র রায় এবং পীরগাছার মন্থনার জমিদার দেবী চৌধুরাণী(বঙ্কিম চন্দ্রের উপন্যাসের -দেবী চৌধুরাণী) সম্মিলিতভাবে পীরগাছার চন্ডিপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ইংরেজদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে পীরগাছার ফকিরটারীর ফকির সন্নাসিরাও শিবচন্দ্র রায়ের পক্ষে যোগ দেয়। অবশেষে শিবচন্দ্র রায় এবং দেবী চৌধুরাণী শহীদ হন। তাদের গোপনে একটি জঙ্গলে সমাহিত করা হয়, যা বর্তমানে একটি গ্রাম, পবিত্রঝাড় নামে পরিচিত। রাজা শিবচন্দ্র রায়ের ডাকে সারা দিয়ে দিনাজপুরের কৃষক নেতা নুরলদীন(সৈয়দ শামসূল হকের কবিতার নূরলদীন) প্রজা বিদ্রোহে ঝাপিয়ে পড়েন। লালমনিরহাট পাটগ্রামে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করে তিনিও শহীদ হন। এই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ফলে রংপুর দিনাজপুরের সাধারণ প্রজারা মুক্তি পান। তৎকালীন ভারতবর্ষে ইটাকুমারী "২য় নবদ্বীপ" নামে পরিচিত ছিল। এই ইটাকুমারীতেই জন্মগ্রহণ করেন মধ্যযুগীও শ্রেষ্ঠ পন্ডিত যাদেবশ্বর তর্করত্ন, শ্রেষ্ট কবি রতিরাম দাশ এবং চৈতন্যদেব সহ আরো অনেকে। মধ্য যুগের শ্রেষ্ঠ কবি রতিরাম দাসের ঐতিহাসিক জাগের গানে শিবচন্দ্রের প্রজাবিদ্রোহের কথা উল্লেখ আছে। এনাদের স্মরণে প্রতিবছর বৈশাখ মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার করে চন্ডিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে "নাপাই চন্ডী" নামক মেলা বসে।"নাপাই চন্ডী" কথাটি এমনি আসেনি। দেবী চৌধুরাণীকে সবাই ভালবেসে চন্ডী মা বলে ডাকত। চন্ডীদেবী প্রাণপণ যুদ্ধ করে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি বলে রংপুরের ভাষায় এই না পাওয়াটাকে "না পাই" বলে! এখান থেকে নাপাই চন্ডী কথাটির উদ্ভব। রাজা শিবচন্দ্র রায়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ওনার নামে জমিদারবাড়ীর নিকটেই একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। "ইটাকুমারী শিবচন্দ্র রায় মহাবিদ্যালয়"। কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান কলেজ অধ্যক্ষ "নজরুল ইসলাম হক্কানী" স্যার। শুরু থেকেই অধ্যক্ষ স্যারের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আজ বার বার কলেজটি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে ঘোষিত হচ্ছে। আর এই জমিদারবাড়ীকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এটাকে পর্যটন কেন্দ্র বানাতে ওনার প্রচেষ্ঠার জুড়ি নেই। শিবচন্দ্র রায় জমিদার বাড়ী" শুধু পীরগাছার নয় বরং সমগ্র বাংলাদেশের একটি গর্ব। তাই এই ঐতিহাসিক নিদর্শনকে বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশব্যাপী ইতিহাসটাকে তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
- লেখাটি পাঠিয়েছেনঃ
রিয়াজ আহমেদ মাসুদ

0 Comments
Post a Comment