•  জাহানুর রাহমান খোকন


১. রফিক সাহেব নেতার খাতায় নাম লেখিয়েছেন। এলাকাতেও শুরু হয়েছে প্রবল শীত, মাঘের শীতের অপেক্ষা না করেই, পৌষের শীতেই গরীব ঘরমূখি মানুষের সংখ্যা দিন কে দিন বেড়ে যাচ্ছে,খেয়ে না খেয়ে তারা গৃহপালিত জীবন যাপন করছেন। ফেসবুক নামক জগতে প্রতিদিন প্রচার হচ্ছে নেতার শীতের কাপড় বিতরণের খবর, ঘুম থেকে জাগার আগেই লোকজনের চেঁচামেচিতে নেতার ঘুম ভাঙ্গে, কেউ যদি সামান্য ভদ্রতা করে বলে আমরা মনে হয় খুব সকালে এসে আপনার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বিরক্ত করলাম, তখন নেতা সহাস্যে উত্তর দিচ্ছেন, আরে না না আপনাদের জন্যই তো আমি সব করতেছি।আপনারা আমার কাছে আসবেন না তো জাবেন কোথায়? নেতার মনে সুপ্ত ইচ্ছে আগামী সংসদ নির্বাচনে দাঁড়াইবেন, তাই সমকালিন সময়ে সাধারন জনগণের জন্য কিছু শীতের কাপড়ের বন্ধবস্ত করতে উঠে পরে লেগেছেন। ছুটছেন এ পাড়া থেকে সে পাড়া, এলাকার ছোট থেকে বড় কেউ তাঁর সালাম না নিয়ে পাশ কাটাতে পারছে না।রফিক সাহেবের ব্যবহারে সকলে মুগ্ধ, সকলের মুখে মুখে শুনা যায় আহা এমন লোক যদি নেতা হয়, এমপি হয় তো দেশে অভাব থাকবে না।

২. একই এলাকার বাসিন্দা নেয়াকতুল্লাহ, সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। ছোটকাল থেকে ইচ্ছে নেতা হবে কিন্তু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী যে স্বয়ং নাকের ডগায় বসেই এলাকার উন্নয়ন করে যাচ্ছে। হিংসায় অন্তর অঙ্গার। আরে বাবা তুমি এলাকার উন্নয়ন করবে করো গে,কে নিষেধ করেছে,কিন্তু এই গরীব মানুষ গুলোকে কম্বল শীতের কাপড় কে কিনে দিতে বলছে। তাঁদের জন্য তো নেয়ামতুল্লার প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখান থেকে টাকা তুলবে আর কিস্তি কিস্তি শোধ করবে। এতে সমাজের মানুষের মাঝে একটা বন্ধন তৈরি  হয় নেয়ামতুল্লাহ বারংবার এই কথাই সবাইকে বুঝান। এলাকার অভাবি মানুষ ও এতোদিন তাই শুনে আসছে, তারা সামান্য অভাবে নেয়ামতুল্লার প্রতিষ্ঠান থেকে  ঋণ নেয় আর তাঁর প্রায় দেড়গুণ সুদ সহ কিস্তি কিস্তি ফেরত দেয়।
নেয়ামতুল্লাহ চিন্তায় পরে যান, তাঁর এতোদিনের সাজানো গোছানো বাগান আজ কি না এক টাকার ছাগলে খেয়ে যাবে?
কিছু কিছু মানুষ আছে যারা তাঁর প্রতিবেশি ভাল কিছু করুক তা সে  চায় না,তার পাশের বাড়ি দিন দিন  উন্নয় করতেছে, তাদের ছেলে ভাল চাকরি করছে এতে তাঁর ফাটে, অন্তর জ্বালা করে। নেয়ামউল্লাহ এমন কিছিমের মানুষ। তাই আর দেরি না করে নেয়ামতুল্লাহ তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে আলোচনায়  বসে যায়, এলাকার সাধারণ মানুষদের নিয়ে মিটিং করেন,ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা করাতে হবে,তাই তাঁদের জন্য হাফ ফ্রি কোচিং সেন্টার খুলে দেন।আর সেই সব কোমলমতি শিশুদের এবং তাঁদের বাবা মায়েদের মাধ্যমে প্রচার করতে থাকেন রফিক সাহেবের দেওয়া কম্বলের পেছনের ইতিহাস। কিছুদিনের মধ্যে এলাকা রাষ্ট্র হয়ে গেল যে রফিক সাহেব তাঁদের এলাকার গরিব মানুষের কথা বলে সরকারের কাছে এতো এতো টাকা নিয়েছেন,আর তাঁর যৎসামান্য টাকাও এলাকার মানুষের কম্বল কিনে খরচ করেন নি।

৩. রফিক সাহেব মর্মাহত হন,কিন্তু তিনি ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন, সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মচারী ছিলেন। একই বনে দুই বাঘ বাস করতে পারে না, কাঁটা দিয়ে কিভাবে কাঁটা  তুলতে হয় তা তিনি ভালভাবেই জানেন। তাই তাকে বড় বাঘ প্রমাণ করতেই হবে। তিনি এলাকার সকল পন্ডিত ব্যক্তি আর পুরানা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে শলাপরামর্শ করেন, পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ পরামর্শ দেন স্কুলে স্কুলে খাতা কলম বিতরণ করতে। রফিক সাহেব কাজে মন দেন, নিজের নামে চ্যারিটি খুলে বিনামূল্যে খাতা কলম বিতরণ শুরু করেন। আবারো এলাকায় গুঞ্জন উঠে রফিক সাহেব আসলেই একজন নেতা মানুষ।
নেয়াকতুল্লার কানে আসে কথা গুলো তিনি উঠে পরে লাগেন এলাকার দখলদারি নিয়ে, নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে সাইনবোর্ড করে এলাকার মোড়ে স্থাপন করেন। রাতারাতি এলাকার নাম পরিবর্তন হয়ে যায়, ক্ষমতার সিংহ ভাগ তাঁর দখলে চলে যায়।  রফিক সাহেব নেতা মানুষ,লেখনিতে তাঁর হাত নাই। সুধিজনের পরামর্শে তিনি কবি খুঁজতে শুরু করেন।  বই মেলায় তাঁর বই প্রকাশ হয়, মুখবন্ধ লেখেন নিজের নামেই,সেখানে ব্যবহার করেন নিজের নামে এলাকার নামকরণ ঠিকানা।
৪. হাকিম এলাকার মেধাবী বেকার ছেলে। সম্মান পাশ করেছে বছর দুয়েক আগে কিন্তু টাকা আর মামু না থাকায় চাকুরিতে আবেদনের সাহস করে নি। চাকুরির আবেদন না করার আরো একটি কারন আছে, এলাকার ঠিকানা বিভ্রাট। জন্মাবদি এলাকার যে নাম দেখে এসেছে তার গত ৩ বছরে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। তাঁর কাকা ছিলেন  লেখক মানুষ। যদিও তাঁর লেখা কোথাও ছাপা হয় নি তবুও তিনি লিখতেন। কাকা তাঁর প্রতিটি গল্পের শেষে ঠিকানা ব্যবহার করতেন কবি পল্লি।
গত ৩ বছরে দুই নেতা তাঁদের নিজেদের নামে ঠিকানার রুপবদল করেছেন দুই বার, আবার বাবা দাদার আমলের নাম তো আছেই। কোন ঠিকানা দিয়ে চিঠি লিখবেন,একটা সরকারি চাকুরির চিঠি আসতে মাঝে মাঝে ৬ মাস, ১ বছর লেগে যায়। ততোদিনে  নামে পরিবর্তন হবে না তো? ঠিকানা যদি আবার পরিবর্তন হয়ে যায়? পিয়ন কে সে খাম হাতে ঠিকানা বিভ্রাটের মধ্যে ফেলতে চান না।

( এই গল্প বা ঘটনা প্রবাহ একান্ত লেখকের কল্পনাপ্রসূ, যদি বাস্তবতার সাথে মিলে যায় তো সেটা কাকতালীয়, আর তাঁর জন্য লেখক দায়ী নয় )