আমরা দেখতে পাচ্ছি গত কয়েক শতাব্দী থেকে, বিশেষ করে গত কয়েক দশকে ইসলাম বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ইসলামের নামে ঘটানো নানা জঙ্গিবাদী ও অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডের দরুন এই বিদ্বেষভাব আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। তারা বিভিন্নভাবেই ইসলামের সমালোচনা করেন। ইসলাম শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল এই দাবিকে অনৈতিহাসিক ও অন্তঃসারশূন্য বলে প্রমাণ করতে তারা কয়েকটি ঘটনার সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন যেমন ইন্তেকালের পর তিন দিন পর্যন্ত তাঁর দেহ মোবারক উম্মাহর নেতা নির্বাচিত না হওয়ার দরুন দাফন না করা, প্রথম চার জন খলিফার তিনজনেরই আততায়ীর হাতে নিহত, আলী-আয়েশা-মোয়াবিয়ার (রা.) দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গ ইত্যাদি।
এ পরিপ্রেক্ষিতে আমার বক্তব্য হলো প্রতিটি ঘটনার সাথে সমসাময়িক পরিবেশ-পরিস্থিতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ঘটনা থেকে সময়কে আলাদা করা যাবে না। ১৪০০ বছর আগের বিশ্বের পরিস্থিতি কি ছিল?
ইসলামপূর্ব আরবের অবস্থা
*.আরব অর্থাৎ যে অঞ্চলে আল্লাহররসুল এসেছিলেন সেখানকার সার্বিক অবস্থা তথা সামাজিক অবস্থা, ধর্মবিশ্বাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, অর্থনীতি ইত্যাদি অবস্থাগুলো অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। হিট্টি সেই আরবদেরকে বলেছেন “একটি সম্ভাবনাহীন জাতি”। তখন পৃথিবীতে বড় বড় দুটো সভ্যতা, দুটো সুপার পাওয়ার। একদিকে রোমান, আরেকদিকে পার্সিয়ান। আর মধ্যখানে উশর মরুভূমি আরব -অবজ্ঞাত, অবহেলিত, উপেক্ষিত, অশিক্ষিত। নামমাত্র অল্প কিছু লোক বংশ পরম্পরায় কাসিদা-কবিতা পাঠ করতো, তাও অশ্লীলতায় ভরপুর। তারা ছিল কুসংস্কারের আচ্ছন্ন, সুস্পষ্ট কোনো জীবনব্যবস্থা ছিলই না, গোত্রপতিদের যখন যা খেয়াল হতো সেটাই আইন। ভূত-প্রেত, মূর্তি সমস্ত কল্পিত বিষয় নিয়ে তারা মত্ত ছিল।
*.সামাজিক অবস্থা কেমন ছিল সেটাসবাই জানে। সমগ্র আরবে পূর্ণ অরাজকতা বিরাজমান ছিল। ব্যাপকভাবে সর্বত্র অত্যাচার, অনাচার, ব্যভিচার, চুরি, ডাকাতি, আত্মকলহ, হত্যা, রক্তপাত অপ্রতিহত গতিতে চলতে থাকত। খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে গোত্রগুলোর মধ্যে শত শত বছর বংশানুক্রমে যুদ্ধ চলত। আরবের অধিকাংশ গোত্রই লুটতরাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। লুটতরাজ কোনো দোষের কাজ বলে গণ্য হতো না। প্রত্যেক গোত্রই অপর গোত্রের ধন-সম্পদ, গৃহ পালিত পশু এমন কি স্ত্রী-কন্যা পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যেত এবং বাঁদি-দাসীরূপে বিক্রি করে অর্থোপার্জন করত। কোনো ব্যবসায়ীদল নিরাপদে কোনো পথ অতিক্রম করতেহলে সেখানকার ডাকাতদেরকে উপযুক্ত ভেট দিতে হতো।
*.আর্থিক অনটনের দরুন চুরির প্রসারও কম ছিল না। এই বিদ্যায় প্রায় সকল লোকই ছিল সুপণ্ডিত। এজন্যই ইসলাম গ্রহণ করতে আসলে রসুলাল্লাহ স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের নিকট থেকে চুরি না করার অঙ্গীকার নিতেন। সর্বদা মারামারি, কাটাকাটি, চুরি, ডাকাতিতে লিপ্ত থাকার দরুন তাদের অন্তরে মায়া মমতার লেশ মাত্রও ছিল না। তারা ছিল মানবাকৃতির হিংস্র প্রাণী।
*.ব্যভিচার অনাচার ব্যপকভাবে প্রচলিত ছিল। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, প্রকাশ্যভাবে ব্যভিচার করাকে ইতরামি মনে করা হলেও গোপনে ব্যভিচার করাকে তারা দোষ মনে করত না। যদিও গুপ্তভাবে ব্যভিচার করা হতো কিন্তু ধর্ষণের পর প্রকাশ্য সভায় স্বীয় বদমায়েশী ও গুণ্ডামির কাহিনী বর্ণনা করাকে গৌরব মনে করত। মক্কা নগরীতেও পতিতা নারীর কোনো অভাব ছিল না। তারা ঘরের সামনে পতাকা টানিয়ে রাখে। পুরুষরা তাদের দাসীদেরকে বলপূর্বক বেশ্যাবৃত্তি করে অর্থ উপার্জন করতে বাধ্য করত।এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, স্বীয় দাসীদিগকে বেশ্যাবৃত্তি করতে বল প্রয়োগ কোরো না (সুরা নুর ৩৩)। আরবদের লজ্জা বলতে কোনো বস্তু ছিল না। কোরায়েশরাছাড়া আর সকলেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উলঙ্গ অবস্থায় কাবা তওয়াফ করত।
*.নারীদের দুর্দশার সীমা ছিল না। তারা পিতা-মাতা, আত্মীয় স্বজনের সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতো না। যুদ্ধে জয়লাভ করলে বিজয়ীগণ বিজিতপক্ষের নারীদের উপর খোলাখুলিভাবে যুদ্ধের ময়দানেই পাশবিক অত্যাচার করে স্বীয় ভোগ-বিলাস চরিতার্থ করত। পুরুষের বিবাহের সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত ছিল না। যার যত ইচ্ছা বিয়ে করতে পারত। পিতার মৃত্যুর পর সমস্ত বিমাতারা পুত্রের স্ত্রীতে পরিণত হতো। মেয়েদের জন্মগ্রহণ করাই যেন ছিল পাপ। যত অবিচার, অত্যাচার ও উৎপীড়ন সবই তাদের ভোগ করতে হতো। মানুষ মেয়েদেরকে কলঙ্ক ওঅপমানের উৎস বলে মনে করত। এমন কি মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে জীবিত মেয়েকে মাটির নিচেপ্রোথিত করা হতো। এই মর্মান্তিক জঘন্য প্রথা সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল। মদ, জুয়া, সুদ ইত্যাদির ব্যাপক প্রচলন ছিল। আরবের এই বর্বরতানিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে, তাই মূল কথায় যাচ্ছি।
রোগ জর্জরিত এক মুমূর্ষের আরোগ্যলাভ
এক কথায় বলতে আরবরা ছিল অত্যন্ত স্বার্থপর আর আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপরতার ভিত্তিতে কোনো সমাজ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। জাতি হিসেবে তাদের গর্ব করার মতো কিছুই ছিল না। ধরুন, একটা রোগী তার সারা শরীরে রোগ। ক্যান্সার, ডায়াবেটিকস, লিভার সিরোসিস, কিডনী নষ্ট, মস্তিষ্ক বিকৃত, সারাগায়ে চর্মরোগ, সমস্ত শরীরে পোকা পড়ে আছে, চোখের দৃষ্টি নাই, দাঁতগুলি সব নষ্ট। এমন অবস্থায় এমন একটা রোগীকে আপনি সেবা করতে লাগলেন। তাকে সেবা করতে কেমন সাধনা, কেমন সবর প্রয়োজন সেটা নিশ্চয়ই সকলেই অনুধাবন করতে পারবেন। প্রতিটা মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুণছে ঐ রোগী। একজন ডাক্তার প্রথমে তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর চিকিৎসা করলেন। তারপর ধীরে ধীরে দেহের কম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোরও চিকিৎসা করলেন। যেমনচুল ছিল না তার চুল গজাতে লাগলো, নখ ছিল না নখ গজাতে শুরু করলো, দৃষ্টিশক্তি ছিল না এখন একটু একটু করে চোখে দেখা শুরু করলো, বধির ছিল সে শুনতে শুরু করলো, পড়ে গিয়েছিল সে দাঁড়াতে শুরু করলো। তখনও শরীরে ক্ষতবিক্ষত অংশ কিছুটা রয়ে গেল। ততদিনে সেই মহান চিকিৎসক যিনি সর্বরোগের ঔষধ নিয়ে এসেছিলেন তিনি দুনিয়া থেকে চলে গেলেন।এই মৃতপ্রায় রোগীটার যার ভেতর এবং বাহিরের হাজারো রোগ তাকে আইসিসিইউ থেকে তাকে বের করে এনে কর্মক্ষম করে তোলা হলো এমন সময় যদি আমরা তার শরীরের সেই পুরাতন ক্ষতচিহ্নগুলো সামনে এনে মূল্যায়ন করতে বসি যে কি আর করছেনডাক্তার? রোগীর কী এমন নিরাময় করছেন, এই যে তার মাথায় এখনও ঘন চুল ওঠে নি, এখনও তার পায়ে একটি কাটা দাগ ইত্যাদি, তবে আমি মনে করি তার থেকে বড় অকৃতজ্ঞ, অবিবেচকআর দুনিয়াতে নাই।
এই মৃতপ্রায় রোগীটার যার ভেতর এবং বাহিরের হাজারোরোগ তাকে আইসিসিইউ থেকে তাকে বের করে এনে কর্মক্ষম করে তোলা হলো এমন সময় যদি আমরা তার শরীরের সেই পুরাতন ক্ষতচিহ্নগুলো সামনে এনে মূল্যায়নকরতে বসি যে কি আর করছেন ডাক্তার?
আল্লাহ বলেছেন, “কুফরি ও মুনাফিকিতে আরবগণ কঠোরতর (সুরা তওবা ৯৭)”। শেষ ইসলাম আরবে আসাই প্রমাণ করে যে আরবরা বিশ্বের বুকে অসভ্য জাতিগুলোর মধ্যে নিকৃষ্টতম ছিল। সেই জাতিটিকে সুসভ্য জাতিতে পরিণত করার কাজটি তো একদিনে করা সম্ভব নয়। তাই কোর'আনও একদিনে নাজিল হয় নি। স্বভাবতই, আবু বকর (রা.), ওমর (রা.) -এর মতো বিশিষ্ট সাহাবীদের বিভিন্ন আচরণের প্রেক্ষাপটেও কমআয়াত নাজিল হয় নি। এভাবেই ক্রমে ক্রমে সাধারণ মানুষগুলোকে সোনারমানুষে পরিণত করেছিল প্রকৃত ইসলাম। তারা মদ খেয়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতো, সালাতে সুরা পড়তেভুল করে ফেলত। তারাই যখন মদ নিষিদ্ধ হলো তখন বাড়িতে সঞ্চিত মদ তারা রাস্তায় ঢেলে ফেলে দিলেন যাতে রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত হয়ে গিয়েছিল। যে আরবে ব্যভিচার কোনো অপরাধ বলেই গণ্য হতো না, সেখানে ব্যভিচার বিলুপ্ত হলো, পতিতাবৃত্তি বন্ধ হলো। আরবদের ঐতিহ্য দাসব্যবসা, ডাকাতি বন্ধ করা হলো। পুরুষরা যত খুশি বিয়ে করতে পারতো সেটাকে কমিয়ে চারটির মধ্যে সীমিত করা হলো, তাও এতিম, অসহায়, বিধবাদের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করে বহু বিবাহের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও সমমূল্যায়ন করার কঠিন শর্ত আরোপ করা হলো। জাতিগতভাবে যারা নিজেরা নিজেরা মারামারি করতো, তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির হাতেই দিয়ে দুইটা সুপার পাওয়ার পরাস্ত হয়ে গেল, একটা নতুন সভ্যতার জন্ম হলো।
এখন ইতিহাসের এত ঘাত-প্রতিঘাত, লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি লোকের প্রাণের বিনিময়ে সমাজতন্ত্র আবিষ্কৃত হলো, গণতন্ত্র আবিষ্কৃত হলো, মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তাধারার পরিবর্তন হলো। এরপর অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে, ঘষা-মাজা করে নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া একটা দাঁড় করানো হলো। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি পর্যায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরিঅভিযোগ করলেন যে যুক্তরাষ্ট্রেরনির্বাচন প্রক্রিয়া দুর্নীতিগ্রস্ত।
আর মধ্যপ্রাচ্যে তো কোনো নির্বাচনইনাই। রাশিয়ার পার্লান্টেকে বলা হয় পুতুল পার্লামেন্ট। আর আমাদের দেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলাতে নির্বাচন বলতে বোঝায় কিছু লোকের দ্বারা মনোনীত ব্যক্তির জোর করে ক্ষমতা দখল। এ বিষয়গুলো সবারই জানা। নির্বাচনের পদ্ধতিটি বর্তমানে যেটা চলছে তার উদাহরণ হচ্ছে বড় মাছ ধরার জাল যেভাবে কাজ করে সেটা। এর বড় ফাঁকগুলো দিয়ে ছোট মাছগুলো বেরিয়ে যায় আর বড় বড় মাছগুলো আটকা পড়ে। ঠিক সেভাবে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতারক, চরিত্রহীন, দুর্নীতিগ্রস্ত লোকটি তৃণমূল পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসে। কিন্তু সে পরে থাকে ভদ্রতার মুখোস।
আধুনিক যুগে রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতির যে সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণীত হয়েছে তাতে নির্বাচন ব্যবস্থা সুস্পষ্ট কর হলেও ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় যখন সারা বিশ্বের এই করুণ দৃশ্য সেখানে ১৪০০ বছর আগের একটি বর্বর সমাজে মাত্র কয়েক বছরে কতটুকু পরিবর্তন রসুল এনেছিলেন সেটা কি কথিত মুক্তচিন্তাবিদদের নজরে পড়ে না? যেখানে ক্রীতদাসদেরকে মানুষই মনে করা হতো না, সেখানে যায়েদকে (রা.) মুক্ত করে রসুলাল্লাহ তাকে নিজের পুত্র ঘোষণা করেছিলেন এবং তাকেই সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন তখন অধিকাংশ প্রসিদ্ধ সাহাবীরাও এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গুঞ্জন তুলেছিলেন। এটা হলো আরবের পূর্ব থেকে চলে আসা জাহিলিয়াতের কুপ্রভাব। রসুলাল্লাহর সংস্পর্শ পেয়েও তারা অনেকেই ভেতরে বাহিরে চূড়ান্ত পরিশুদ্ধ হতে পারেন নি, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই। তারা তো ফেরেস্তা হবেন না, তারা মানুষ ছিলেন তাই ভুল করবেন, আর ভুল ক্ষমা করবেন আল্লাহ। কিন্তু আদর্শ মানুষ ছিলেন রসুলাল্লাহ। তিনি ধীরে ধীরে আত্মিক, চারিত্রিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরবদেরকে একটি ন্যূনতম জায়গায় নিয়ে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে সভ্যতার বীজ বপন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াতে তখনও কোনো সহজ-সরল ব্যবস্থা গড়ে উঠে নি। শুধু কতগুলো মৌলিক নীতিমালা ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে। যেমন:
১. যে লোক নেতৃত্বের পদপ্রার্থী তাকে কোনো অবস্থাতেই নেতৃত্বের আসনে বসানো হবে না।
২. উত্তরাধিকারসূত্রে নেতা নির্বাচিত হবে বা কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের মধ্যে নেতৃত্ব আবর্তিত হবে এমন ধারণা ইসলামে নেই।
৩. জনগণ যাকে অপছন্দ করবে সে কোনোভাবেই নেতৃত্ব লাভ করতে পারবে না।
৪. একবার জাতির সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়ে গেলে আর তার বিষয়ে কোনো মতবিরোধ করা যাবে না। যারা পরামর্শের বেলায় তার বিরুদ্ধে ছিল তারাও আর পৃথক অস্তিত্ব বজায় রেখে বিরুদ্ধবাদ চালিয়ে যাবে না। সবাই এক অখণ্ড জাতি হয়ে মূল লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হবে।
৫. জনগণের নেতা কখনও জনবিচ্ছিন্ন হতে পারবেন না। নেতা জনসেবার নামে জনগণের সম্পত্তি ভোগ করবে না। তিনি মসজিদে সালাতেরও ইমামতি করবেন। জনগণের সামনে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী কোনোকাজ করলে মুসলিমরা যে কোনো সময় তাদের আনুগত্যের শপথকে ফিরিয়ে নিতে পারবে। তখন তিনি নেতৃত্বের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।
যে সমাজে কেউ নেতৃত্বের জন্য লালায়িত নয়, বরং এ দায়িত্ব থেকে সবাই বাঁচতে চায় সেই সমাজে নেতা নির্বাচন করা তেমন জটিল কোনো কিছু নয়, কেবল প্রস্তাবিত এক ব্যক্তির আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়ার বিষয়। এই প্রস্তাবনা যে কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে আসতে পারে, বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব আসতে পারে আবার কোনো নির্দিষ্ট পরামর্শক পরিষদ থেকেও আসতে পারে। মূলনীতি ঠিক রেখে যুগের উপযোগী নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন করতেওকোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যে সমাজে বহু মানুষ ক্ষমতালিপ্সু, তারা গদিতে বসার জন্য শিয়াল-কুকুরের মতো কামড়া-কামড়ি করতে থাকে, একটি ওয়ার্ডের সভাপতি পদের জন্য দলের লোককে খুন করে ফেলে সেইসমাজে উপযুক্ত নেতা নির্বাচন করা খুবই জটিল। আরো জটিল নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা, বিশেষ করে বিরোধীদলকে বশে রাখা। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধীদল পুরো মেয়াদজুড়ে শত্রু হিসাবে একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপ্রচার, ক্ষতি করার চেষ্টা ও দমন পীড়ন চালিয়ে যেতে থাকে।
ইসলাম যে উন্নত মানবিক চরিত্র সম্পন্ন মানুষ আশা করে রসুলাল্লাহর (সা.) এন্তেকালের সময় তেমন মানুষ, আবু বকরের (রা.) মতো লোক, ওমরের (রা.) মতো মানুষ ঐ জাতির মধ্যে বহুসংখ্যক তৈরি হয়ে গেছেন। তাদের নেতৃত্বের বিভিন্নবিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকেই কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার, জাতির সম্পত্তির আমানতদারী নিয়ে প্রশ্ন তোলার কেউ নেই পৃথিবীতে। আর আজ আধুনিক নির্বাচন পদ্ধতিতে কেউ একজন ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে নেন। জাহেলিয়াতের যুগে যে ওমর (রা.) যে মক্কার একজন সন্ত্রাসী প্রকৃতিরমানুষ ছিলেন, তাকে রসুলাল্লাহ ইসলামের মহান খলিফায় রূপান্তরিতকরেছিলেন। এখন প্রশ্ন তোলা হয় তাকে নির্বাচিত করার পদ্ধতিটি সঠিক ছিল কিনা? তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন, সেই সময়ের মানুষ তো তাকে খলিফা হিসাবে মেনে নিয়েছিলেন এবং অনাবিল সুখে, শান্তিতে, নিরাপত্তায়, সমৃদ্ধির মধ্যে জীবনযাপন করেছিলেন। তারা তো এই আপত্তি তোলেন নি? সুতরাং সে পদ্ধতিটি নিশ্চয়ই সে যুগের মানুষের বোধগম্য ছিল, সমর্থিত ছিল। সেখানে আপনাদের আপত্তির কী কারণ থাকতে পারে?
কাজেই এখন ১৪০০ বছর পরে এসে, সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে এসে দাঁড়িয়ে, উদারনৈতিক গণতন্ত্রের যুগে এসে সেই আইয়্যামে জাহিলিয়াতের সমাজ কাঠামোকে বিবেচনা করতে পারবেন না। এটা কঠিন হবে। তখনকার তুলনায় অনেক অনেক বেশি সমৃদ্ধি, ঐক্য, গতিশীলতা আনয়ন করেছিলেন রসুলাল্লাহ। তথাপি তাঁর এন্তেকালের পর যে সাময়িক দ্বিধাগ্রস্ততা সৃষ্টি হয়েছিল সেটা ছিল অনাকাক্সিক্ষত। একটি জাতির জাতীয় চরিত্র পরিবর্তন করা চাট্টিখানি কথা নয়, এটা একটি বিরাট সময়সাপেক্ষ অভিযোজনের বিষয় যা একটি নতুন জীবনশৈলীর চর্চার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। যত দিন যায় ততদিন সেটা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। রসুলাল্লাহসেই পথে জাতিটিকে নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন কিন্তু এক জীবনে একটি জাতির সকলের চরিত্রকে বিপরীত করে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তাঁর এন্তেকালের পর অনেকের মধ্যেই পূর্বের জাহেলিয়াতের চিন্তাভাবনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু যখন মুসলিম উম্মাহ আবু বকরের (রা.) নেতৃত্বের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় তখন স্বল্পতম সময়ে সকল ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে উম্মতে মোহাম্মদী আবার সুসংহত অখণ্ড সত্তায় ফিরে গিয়েছিল। এরই মাঝে যে দুঃখজনক ও বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো হয়েছে সেটা হতো না, সেটা ইসলামের শিক্ষাও নয়। তার পেছনে ছিল গোত্রীয় আধিপত্যবাদে বিশ্বাসী কিছু ব্যক্তির সীমালংঘন। সেটাও হতো না যদি রসুলাল্লাহর সংস্পর্শে এসে ভিতরে বাহিরে আপাদমস্তক মৃত্যুব্যাধিতে আক্রান্ত আরববাসী পূর্ণরূপে সুস্থ তথা পরিশুদ্ধ হতে পারত। কিন্তু সেটা হতে পারে নি, অনেকের মধ্যে দুর্বলতা ছিল। কিন্তু এটুকু দিয়ে রসুলাল্লাহর কর্মপদ্ধতির, তাঁর উদ্দেশ্যের, তাঁর পরিচালনা প্রক্রিয়ার দোষ ধরতে পারেন না। তিনি যে লক্ষ্যে জাতিটাকে তৈরি করেছেন সেই লক্ষ্যেই জাতিটি তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছিল এবং সেই ছোট্ট জাতিটি ধীরে ধীরে বিশ্বের বুকে অনুসরণীয় একটি সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল যারা সর্ব বিষয়ে সকল জাতির শ্রেষ্ঠ হয়েছিল। এটাই ছিল ইসলামের লক্ষ্য। যারা ইসলামের বিদ্বেষী ইসলামের এই শত শত বর্ষের সোনালি যুগের ইতিহাস তাদের চোখে পড়ে না। তারা কেবল সামনে আনেন সেই দুঃখজনক ঘটনাগুলো যা ইসলামের নীতি লঙ্ঘন করে করা হয়েছে, যেগুলো ছিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফসল যেমন উটের যুদ্ধ, সিফফিনের যুদ্ধ ইত্যাদি। নির্মোহ দৃষ্টিতে ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করলে তারা অবশ্যই দেখতে পেতেন যে রসুলাল্লাহ সম্পূর্ণরূপে একটা জাতিকে কোথা থেকে, কোন পরিস্থিতি থেকে কোথায় তুলে এনেছেন এবং তাঁর চূড়ান্ত যাত্রা কোন অভিমুখে সেটাও তারা দেখতে পেতেন।
শেষ কথা হলো, একটি জীবনব্যবস্থার সফলতা ব্যর্থতা নির্ভর করে সেটা যে লক্ষ্যে যাত্রা শুরে করেছিল শেষ অবধি তা অর্জিত হলো কিনা তার উপর। গত কয়েক শতাব্দীতে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ ইত্যাদি অনেক জীবনব্যবস্থা তৈরিও প্রয়োগ করেছে মানুষ কিন্তু একটা জীবন্যবস্থাও মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে পারে নি, মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত করতে পারে নি, অন্যায় অশান্তি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি, পৃথিবীজোড়া যুদ্ধ, রক্তপাত, দাঙ্গা বন্ধ করতে তো পারেই নি বরং তা বহু বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা মুখের কথা নয়,এটা বাস্তবতা ও পরিসংখ্যান। এটাই হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার প্রমাণ। তত্ত্ব যতই মনোহর হোক কার্যক্ষেত্রে তা শান্তি দিতে না পারলে তা ব্যর্থ।পক্ষান্তরে পারস্পরিক দাঙ্গা হাঙ্গামায় লিপ্ত, চরম অবজ্ঞাত, উপেক্ষিত, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অনৈক্য এক কথায় আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত সেই অসভ্য ও বর্বর আরব জনগোষ্ঠীকে অতি অল্পসময়ের ভিতরে তুলে এনে যিনি ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, যুক্তিশীল, আলোকিত, মানবতার কল্যাণে জীবনসম্পদ উৎসর্গিকৃত, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, সামরিকশক্তিতে সেরা জাতিতে পরিণত করেছিলেন, এত বড় পরিবর্তন ও কর্মযজ্ঞ যাদের দৃষ্টিতে পড়ে না তাদের চেয়ে বড় অন্ধ আর কেউ হতে পারে বলে আমার মনে হয় না। অন্ধের সামনে অসীম আকাশের কী মূল্য আর প্রচণ্ড উজ্জ্বল সূর্যেরই বা কী মূল্য?
পোস্টটি যিনি লিখেছেনঃ
Riyadul Hassan
fb id: Riyadul Hassan


0 Comments
Post a Comment