মরা বাঙালিরা অত্যন্ত আবেগ প্রবণ। অনেকসময় না বুঝে এমনকিছু কাজ করি যা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন তো হয় না বরং দেশকে অবমাননা করা হয়। ছবির মহিলাটি জাতীয় পতাকার আদলে যে শাড়ীটি পড়েছে তা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত সে তর্কে যাবো না। মানুষের দৃষ্টিতে মহিলাটি দোষী সাব্যস্ত হলে যারা এ শাড়ীর ডিজাইন তৈরি করেছেন তারাও মহিলাটির মতো সমভাবে দোষী তো বটে বরঞ্চ একটু বেশি হবে। ' জাতীয় পতাকা বিধিমালা-১৯৭২ ' ভঙ্গ হয়েছে কিনা তা আইনবিদগণ ভাল বলতে পারবেন। তবে আমার কাছে এটি কোনভাবেই ফ্যাশন বা ডিজাইন হিসেবে গণ্য হতে পারে না।জাতীয় পতাকা একটি রাষ্ট্রের পরিচয়, জাতীয়তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতীক হচ্ছে আমাদের প্রিয় লাল সবুজপতাকা। কিন্তু আমাদের দেশে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতীক ব্যবহারের বিধি সম্পর্কে জনগণ জানে না কিংবা জেনেও মানে না; অথচ এর ব্যবহারের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট বিধিমালা।বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সবুজ আয়তক্ষেত্রের মধ্যে লাল বৃত্ত। সবুজ রং বাংলাদেশের সবুজপ্রকৃতি ও তারুণ্যের প্রতীক, বৃত্তের লাল রং উদীয়মান সূর্য, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারীদের রক্তের প্রতীক। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার এই রূপটি ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সরকারীভাবে গৃহীত হয়।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় একই রকম দেখতে একটি পতাকা ব্যবহার করা হতো, যেখানে মাঝের লাল বৃত্তের ভেতর হলুদ রংয়েরএকটি মানচিত্র ছিল। পতাকার উভয় পাশে সঠিকভাবে মানচিত্রটি ফুটিয়ে তোলার অসুবিধার কারণে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তা সরিয়ে ফেলা হয়।

জাতীয় পতাকা বিধিমালা-১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০) মোতাবেক -পতাকা ব্যবহারের কিছু বিধি-বিধান সহ কখন কিভাবে কত অায়তনের তৈরি করা যাবে তা বর্ণিত রয়েছে। কারা গাড়ীতে বা জলযানে পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন সেটিও বলা আছে। সরকার ঘোষিত বিভিন্নদিবস উৎযাপন সহ বিশেষ প্রয়োজন মনে করলে অন্য যে কোনদিন বাসা-বাড়ী, দোকানপাট সহ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি অফিসসমূহে পতাকা উত্তোলণ করতে হবে।ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহারের বিধি নিষেধ:অনেকেই জাতীয় পতাকায় নকশা করে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু জাতীয় পতাকার ওপর সরকারিভাবে কিছু লেখা বা মুদ্রিত করা যাবে না অথবা কোনো অনুষ্ঠান বা উপলক্ষে কোনো চিহ্ন অঙ্কন করা যাবে না; এমনকি জাতীয় পতাকাকে পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না এবং গায়ে জড়িয়ে রাখা যাবে না। তবে পূর্ণ সামরিক মর্যাদা বা পূর্ণ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করা হলে তাঁর শবযাত্রায় জাতীয় পতাকা আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।অন্যান্য ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ:আজকাল খেলার সময়, বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রেমীরা বাসভবনে নিজ সমর্থনীয় দেশের পতাকা এমনভাবে ওড়ান, যাতে দেশের জাতীয় পতাকা নিচে পড়ে থাকে। কিন্তু কাজটি বেআইনি। কেননা আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পতাকার ওপরে অন্য কোনো পতাকা বা রঙিন পতাকা ওড়ানো যাবে না।মিছিলে পতাকা বহনের বিধান হচ্ছে, পতাকা মিছিলের কেন্দ্রে অথবা মিছিলের অগ্রগমন পথের ডান দিকে বহন করতে হবে।অনুমতি ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জাতীয় পতাকাকে ট্রেডমার্ক, ডিজাইন বা পেটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করাও অপরাধ।কোনো অবস্থায়ই পতাকা নিচে অবস্থিত কোনো বস্তু যেমন—মেঝে, পানি ও পণ্যদ্রব্য স্পর্শ করবে না এবং কবরের ওপরে স্থাপন করার সময় পতাকাটিকবরে নামানো যাবে না কিংবা মাটি স্পর্শ করবে না। এ ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ, ধারণ বা বিলি করার জন্য পতাকাকে ব্যবহার করা যাবে না। পতাকা এমনভাবে উত্তোলন, প্রদর্শন বা মজুদ করা যাবে না, যাতে এটি সহজেই ছিঁড়ে যেতে পারে, মাটি লাগতে পারে বা নষ্ট হতে পারে। কোনো দেয়ালে দণ্ড বিহীন পতাকা প্রদর্শিত হলে তা দেয়ালের সমতলে এবং রাস্তায় প্রদর্শিত হলে উলম্বভাবে দেখাতে হবে।গণ-মিলনায়তন কিংবা সভায় পতাকা প্রদর্শন করা হলে বক্তার পেছনে ও ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে হবে।জাতীয় পতাকা কোনো অবস্থায়ই সমতল বা সমান্তরালভাবে বহন করা যাবে না এবং উত্তোলনের সময় সুষ্ঠু ও দ্রুতলয়ে উত্তোলন করতে হবে এবং সসম্মানে অবনমিত করতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলনের সময় জাতীয় সংগীত গাইতে হবে এবং যখন জাতীয় সংগীত বাজানো হয় এবং প্রদর্শিত হয়, তখন উপস্থিত সবাইকে পতাকার দিকে মুখ করেদাঁড়াতে হবে।মোটরগাড়ি, নৌযান, উড়োজাহাজ ও বিশেষ অনুষ্ঠান ব্যতীত অন্যান্য সময় পতাকা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উত্তোলিত থাকবে এবং সূর্যাস্তের পর কোনো মতেই পতাকা উড্ডয়ন অবস্থায় থাকবে না।জাতীয় পতাকা শুধু একটি কাপড় নয়, এটি দেশের স্বাধীনতার প্রতীক। পতাকার রয়েছে নির্দিষ্ট মাপ। একটি শাড়ী কিংবা কোন পোশাকে সেই নির্দিষ্ট মাপথাকতে পারে না। জাতীয় পতাকা ব্যবহারের এসব বিধি ভঙ্গ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কেউ ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বাপাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।


পুনশ্চ: ছবিটি ফেসবুকের ওয়াল থেকে এবং জাতীয় পতাকা সম্পর্কিত বিধি বিধি-বিধান নেট থেকে সংগৃহীত।