১.
ট্রেন রংপুর স্টেশন থেকে কুড়িগ্রাম স্টেশনের দিকে ছুটে চলছে। ঠিক আগের মতই ঝকঝক শব্দ করেই চলছে...
অন্তু,
বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা হাত হঠাৎ বাহির থেকে ভিতরে নিয়ে নিলো। তার হাসিমাখা মুখ বিষাদের ছাপে ভরে ওঠলো। এইতো কিছুক্ষণ আগেও যার প্রফুল্ল প্রাণ ছিলো, সে এখন কি যেন একটা কিছু ভাবছে। এর ওপর চোখের কোণে জল । ইহা চিন্তা নাকি দুশ্চিন্তা বুঝে ওঠতে না পেরে মন্তু প্রশ্ন করে বসলো।
এই অন্তু তোর কি হলো...?
এমন করে কি ভাবছিস...?
আর কেনই বা কাঁদছিস...?
কিছুনা রে, অন্তু বলে।
মন্তু পূর্বাপেক্ষা জোড়ালো কন্ঠে বলে
কিছু না বললেই হলো।
সত্যিকরে বল কি নিয়ে এতো চিন্তিত তুই?
অন্তু, থাকনা আর একদিন বলবো।
মন্তু, না আমি আজই শুনবো। তোকে এখনি এই মুহূর্তে বলতে হবে।
অন্তু বলল তবে শোনাচ্ছি-
...তার আগে বল তোর কি মুহিদ ভাইয়ের কথা স্মরণ আছে?
মন্তু কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল-
মুহিদ ভাই...
তোর রুমমেটের অর্থাৎ শাহআলম ভাইয়ের গেস্ট কি?
হুম ঠিক চিনতে পেরেছিস।
আচ্ছা মন্তু তুইকি জানিস মুহিদ ভাই আমাদের মাঝে আর নেই।
নেই মানে! কোথায় থাকেন এখন।
অন্তু ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় অস্পষ্ট স্বরে জবাব দেয়-
উনি না ফেরার দেশে পারি জমায়েছেন। একথা বলে অন্তু নিশ্চুপ হয়ে যায়। মন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করে তার শরীরের লোমগুলো শিউরে ওঠেছে। হৃদয়ের মাঝে যেন কিছু একটা হয়ে গেল।
কিছু সময় পর অন্তু বলল মনদিয়ে শোন সেই মুহিদ ভাইয়ের কথা।
মন্তু বললো বল তবে...

২.
অন্তু এবং মন্তু ট্রেনের একই কামরায় পরস্পরের মুখোমুখী বসা। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। পরে অন্তু ট্রেনের ছোট্ট জানালার ফাঁক দিয়ে প্রকৃতির পানে অপলক তাকিয়ে বলতে আরম্ভ করলো-
তখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০০৫ সাল। সামনে মুহিদ ভাইয়ের এসএসসি পরীক্ষা। এক সকালবেলা ছিমছাম বৃষ্টি পড়ছিলো। আকাশটা কেমন রুপে আছে তা মেসের(ছাত্রাবাস) ভিতর থেকে ঠাওড় করা যায় না। দুর প্রকৃতিকে দেখবার সাদ যেন কেড়ে নিয়ে বসে আছে মুহিদ ভাইদের সামনের মেসটা। টিনের চালে টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ। তবুও মন ভালো নেই মুহিদ ভাইয়ের। হঠাৎ বালিশের নিচে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠলো। মুহিদ ভাই রিসিভ করলেন।
একটি বয়ষ্ক কণ্ঠস্বর-
বাবা মুহিদ তোর মা যে আর নেই বাবা। তুই দ্রুত বাড়িতে আয়।
মুহিদ ভাইয়া কাঁদতে শুরু করলেন। কান্নার শব্দ পেয়ে মেসের বাকিরা ছুটে আসে। মুহিদ ভাইয়ার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না মা আর নেই। পরে অাত্মসংবরণ করে দ্রুত নাগেশ্বরী প্রস্থান করে যাত্রাপুরের পথে পা বাড়ালেন। ছিমছাম বৃষ্টিতে চরের বালুগুলো আজ শান্ত হয়ে আছে। মুহিদ ভাই বিস্তৃন চরের বুক চিরে হাঁটতে থাকলেন। আর মনে মনে মায়ের কথা ভাবছে। উনার মনে পড়ছে মায়ের আদরের কথা। মনে পড়ছে মায়ের শাসনের কথা। অনেকটা পথ পারি দিতে হবে বলে বালুকার বুকে চিহ্ন এঁকে দ্রুত পা বাড়ানো আরম্ভ করলেন...

৩.
মায়ের অকাল মৃত্যুতে সেবার মুহিদ ভাইয়ার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। পরে ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে পরীক্ষা দিলেও দু'বারই অকৃতকার্য হন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে পাশের সাদ ভাগ্যে জোটে। এমনিকরে মায়ের আদর, ভালোবাসা বিহীন চারটি(০৪) বছর কেটে যায়। ততোদিনে উনার মস্তিষ্কের ব্যথাটা অনেক বেড়েছে। তা যেন সহ্যর সীমা পেরিয়ে চলছে। আশঙ্কা বুঝতে পেরে ঢাকার পিজি হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসা করান। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন মুহিদ ভাই। কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ ছিলো উনি যেন আর লেখাপড়া না করেন। লেখাপড়ার প্রতি প্রবল ইচ্ছা ছিলো মুহিদ ভাইয়ের। তাই ২০০৯ সালে নাগেশ্বরী ডিগ্রী কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি নেন। পূর্বের মেস পরিবর্তন করে চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীর এবং শাহআলমের সাথে নতুন মেসে ওঠেন। জাহাঙ্গীর ভাই মুহিদ ভাইয়ার থেকে বয়সে বড়। আর শাহআলম ভাই সেম বয়সী। অনেক কষ্ট আর যন্ত্রণার পর এবার যেন একটু সুন্দর সময় কাটছে মুহিদ ভাইয়ের। এভাবে মাসের পর মাস কাঁটতে থাকলো। পরিচিত হয়ে ওঠলো নাগেশ্বরীর আন্বিকা মেস(ছাত্রাবাস)। এমন সুখের দিনে আর একটি সুখের সন্ধান মেলে মুহিদ ভাইয়ের। নিজেকে উজাড় করে দেন সেই সুখের সাগরে। কি আশ্চার্য সে সুখ। কোথা হতে সে এলো...? কেন এতোদিন পর এলো...? এ প্রশ্নগুলো মুহিদ ভাইয়ার মনে বারংবার নাড়া দিতো।

৪.
সেদিন সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীর ভাইয়ার ফোনটা অনবরত বাজতে ছিলো। সেসময় ভাইয়া বাথরুমে ফ্রেশ হচ্ছিলেন। একটুপরে জাহাঙ্গীর ভাইয়া ডাক দিয়ে বলেন-
মুহিদ দেখতো কে ফোন করেছে...? আর বল যে, ভাইয়া বাথরুমে ফ্রেশ হচ্ছে।
মুহিদ ভাইয়া কল রিসিভ করলো। সালাম দিয়ে জানতে চাইলেন -
কে আপনি...?
আমি রুবি। আর জাহাঙ্গীর কোথায়...?
উনি ফ্রেশ হচ্ছেন, মুহিদ ভাই জানালেন।
আবার প্রশ্ন করলো-
আপনি কি মুহিদ বলছেন...?
মুহিদ ভাই বিস্ময়ের সুরে বললেন... হ্যাঁ। কিন্তু...
কোন কিন্তু নয়। জাহাঙ্গীর আপনার কথা অনেকবার আমাকে বলেছে।
মুহিদ ভাই বলল ও তাই বুঝি।
তো আপু ভালো আছেন...?
রুবি আপু বলল হ্যাঁ ভালো আছি। একদিন সময় করে ভাইয়ার সাথে আসিয়েন। সাক্ষাৎ করবো, কেমন।
মুহিদ ভাই জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেন-
কোথায় যাব...?
কেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে, রুবি আপু বললেন। মুহিদ ভাই বললেন আচ্ছা। ততোক্ষণে জাহাঙ্গীর ভাইয়া এসে পড়েছে। মুহিদ ভাই ফোনটা জাহাঙ্গীর ভাইয়াকে দেন। জাহাঙ্গীর ভাইয়া ফোন নিয়ে ইয়ারকীর(মজাক) ছলে রুবি আপুকে বলেন এতো কথা কিসের...?
রুবি আপু বলেন সত্যি মুহিদ অনেক অনেক ভালো ছেলে। একদিন নিয়ে আসো, কেমন।
হ্যাঁ নিয়ে যাব। তবে...
তবে কি? রুবি আপু জানতে চায়।
জাহাঙ্গীর ভাইয়া বলেন-
যদি খায়াও।
রুবি আপু বলেন-
আচ্ছা আচ্ছা শুধু খায়াবো কেন, তোমার ভাইকে একটা পরীর হাতে তুলে দিব।
কথা চলতে থাকলো রুবি আপু ও জাহাঙ্গীর ভাইয়ার মধ্যে...

৫.
পরেরদিন সকালবেলা জাহাঙ্গীর ভাই মুহিদ ভাইকে বললো তাড়াতাড়ি রেডি হ। কুড়িগ্রামে যাব।
আনন্দ রাখবার জায়গা নেই মুহিদ ভাইয়ার। দ্রুত বেড়িয়ে পড়লেন। জাহাঙ্গীর ভাই সহ বাইকে করে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে এলেন। তখন সময় সকাল ১০.৩০ টা। একটু পরে রুবি আপু একটি মেয়ে সহ আসলেন। এসেই বললেন মুহিদ কেমন আছো?
ভালো আপনি কেমন আছেন?
এই তো ভালো আছি মুহিদ। তোমাকে পরিচয় করায় দেই। এ(সাথে আসা মেয়েটাকে ইঙ্গিত করে রুবি আপু বললেন) হচ্ছে অন্তরা। আমার চাচাতো বোন। বাসা থেকে আমার কাছে এসেছে। কুড়িগ্রাম শহরটা একটু ঘুরে দেখবে বলে। আর তোমার ভাইয়া একে অনেকবার দেখেছে।
ও হ্যাঁ... অন্তরা এ হচ্ছে মুহিদ। তোমার জাহাঙ্গীর ভাইয়ার চাচাতো ভাই।
সেই সময় মুহিদ ভাইয়া রুবি আপুকে বললেন-
এভাবে পরিচয় দিচ্ছেন কেন? বরং বলেন আমি আপনার দেবর। তখন সবাই হাসতে লাগলো। অন্তরা আপুও দু'হাতে মুখ চেপেরেখে হাসছেন। কি অপূর্ব সে হাসি যেন মুহিদ ভাইয়ের চোখ ফিরবারই জো-নেই। পরে রুবি আপু বাদাম নিয়ে মুহিদ ভাই এবং অন্তরা আপুকে দিয়ে বললেন খাও আর দু'জনে গল্প করো। কথা মত কাজ। অন্তরা আপু এবং মুহিদ ভাইয়া নরম ঘাসের উপর বসে গল্প শুরো করলেন। ওদিকে রুবি আপু আর জাহাঙ্গীর ভাই গল্প করছেন। গল্পের শেষ প্রান্তে এসে মুহিদ ভাই বুঝতে পারলেন যে, অন্তরা আপু উনার ক্লাশমেট। অর্থাৎ দু'জনেই ইন্টার প্রথম বর্ষে। পরে মুহিদ ভাই বললো আমরাতো তাহলে বন্ধু।
কি বলেন?
অন্তরা আপু বললেন -
তবে আপনি সম্বন্ধ কেন?
অতঃপর দু'জনে অট্ট হেঁসে ওঠলেন...

৬.
মেসে ফিরে সেদিন রাতের ঘুম ভালো কাটলোনা মুহিদ ভাইয়ের। সারারাত অন্তরা আপুকে নিয়ে ভাবলেন। আরো ভাবলেন মানুষ এতো সুন্দর করে হাসতে জানে তা হয়তো অন্তরাকে না দেখলে জানাই হতোনা। আরো ভাবেন তবে কি এই অন্তরা রুবি আপুর সেই পরী! যার হাতে আমাকে দিতে চেয়েছিলো...
পরক্ষনে, ধুর কি থেকে কি ভাবছি। আমি কি তার প্রেমে পড়েছি যে রাতভর তাকে নিয়ে ভাববো। কিন্তু আজ ঘুম আসছেনা কেন! এভাবে অনেক দিন কেটে যায়। মাঝে উনাদের আরো কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছিলো। ইদানীং দু'জনে ফোনে কথা বলেন। পরবর্তীতে এমনিকরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দু'জন দু'জনার প্রেমে পড়ে যান। এদিকে ২০১০ সাল কাটতে চলছে। দু'জনারই সামনে এইচ এসসি পরিক্ষা। রাত জেগে জেগে দু'জনে পড়েন। আর মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলেন। কত রকম স্বপ্নে দু'জন রাঙিয়ে নেন নিজেকে, রাঙিয়ে নেন ভবিষ্যত সংসারকে; তার ইয়ত্ত্বা নেই। এইচ এসসি পরীক্ষা হয়ে গেল। দু'জনেই পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু বিধির বাম অন্তরা আপু পাশ করলেও মুহিদ ভাই অকৃতকার্য হন। পরেরবার অর্থাৎ ২০১১ সালে মুহিদ ভাই ইন্টার পাশ করেন। ততোদিনে অন্তরা আপু কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেনিতে ভর্তি নিয়েছেন। ইদানীং অন্তরা আপু ফোনে বেশি কথা বলতে চাননা। সাক্ষাৎ ও করতে চাননা। যেন আচমকা কেমন একট পরিবর্তন। মুহিদ ভাই এই রহস্য বুঝতে পারেননা। কেবল কষ্ট পান। অন্তরা আপু সম্মান শ্রেণিতে আর মুহিদ ভাই কেবল ইন্টার পাশ করলো। ইহা কেমন যেন একটা ব্যবধান। কেমন যেন একট বৈষম্য। সত্যি সত্যি সেই ব্যবধান আর বৈষম্য তাদের সম্পর্কের মাঝে কাল হয়ে দাঁড়ালো। তাদের এতোদিনের সম্পর্ক ভেঙ্গে গেল। স্বপ্নগুলো সব ভেস্তে গেলো।
মুহিদ ভাই এটা সহ্য করতে পারলেননা। মাথাটাও কেমন যেন একটু একটু ব্যথা করছে উনার। পরেরদিন মুহিদ ভাই অসুস্থতার অভিনয় করলে অন্তরা আপু আর নিজেকে পাথর করে রাখতে পারেননি। ঠিক ছুটে গেলেন নাগেশ্বরী ডিগ্রী কলেজ মাঠে। সেখানে বন্ধু শাহআলম সহ মুহিদ ভাই বসে ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ কথা হলো। ভাঙ্গা প্রেম আবার জোড়া লাগলো। এখন যেন দু'জন দু'জনকে আগের থেকেও বেশি ভালোবাসেন। ঘনঘন কুড়িগ্রামে সাক্ষাৎ করেন। এমনকি এক পলক দেখবার জন্য মুহিদ ভাই অন্তরা আপুর বাসা অর্থাৎ চিলমারিতে যেতেন। আজকাল যেন সম্পর্কটা সহস্র বছরের চেনা জানা বলে মনে হয়। হয়ত সেই কারণেই একের প্রতি অন্যের এতো টান।

৭.
জাহাঙ্গীর ভাই ও রুবি আপুর বিয়ে হয়ে গেল। সেই হাওয়া বৈতে বৈতে এসে কড়া নাড়লো মুহিদ ভাই ও অন্তরা আপুর কাঠগড়ায়। ঠিক, ২০ অক্টোবর ২০১২ তে উনারাও বিবাহ করেন। তবে অতি গোপনে। শাহআলম ভাই উপস্থিত ছিলেন। সমাজের চোখে ফাঁকি দিয়ে কাটতে থাকলো সময়। সে বৎসরেই মুহিদ ভাই কুড়িগ্রাম মজিদা আদর্শ কলেজে মানবিক বিভাগে ডিগ্রী কোর্সে ভর্তি নেন। ততোদিনে শাহআলম ভাই কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে প্রাণিবিদ্যায় অনার্স করছেন। সুবাদে মুহিদ ভাই পরীক্ষার সময়গুলোতে শাহআলম ভাইয়ের মেসে অর্থাৎ আমাদের মেসে এসে থাকতেন। হয়তো গেস্ট থাকতে ভালোলাগেনা বিধায় পরবর্তিতে ইমরান ছাত্রাবাসে ওঠেন। সেখান কয়েক মাস কাটাবার পর হঠাৎ একটা জব হয়ে যায়। রহিমা আফরোজ কম্পানিতে। নতুন ঠিকানা করেনেন লালমনিরহাটে। এমনি করে ভাঙ্গা গড়ার মধ্যদিয়ে চলতে থাকে মুহিদ ভাইয়ের জীবন। ২০১৬ সাল এসে উপস্থিত। কিছুদিন পর মুহিদ ভাইয়ের ডিগ্রী ৩য় বর্ষের পরীক্ষা। চাকরি ছেড়ে দেন। সোজা চলে আসেন শাহআলম ভাইয়ের কাছে। শাহআলম ভাই আমার রুমমেট। আমাদের মেসের নাম সরকার ভিলা। মুহিদ ভাই ভিশন পড়াশোনা শুরু করে দিলেন। মাঝে মাঝে গল্প হতো উনার সাথে। অনেক মজার মানুষ মুহিদ ভাই। আর সহজ সরল।
আচ্ছা মন্তু তুইও তো সেই সময়ই মুহিদ ভাইয়া কে দেখেছিলি।
মন্তু হুম জবাব দিয়ে চুপসে যায়।
অন্তু আবার শুরু করে।
একটা- দুটা করে পরীক্ষা শেষের দিকে। সেদিন শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে সোজা অন্তরা আপুর মেসের সামনে এসে মুহিদ ভাই অন্তরা আপুকে ফোন করেন। আপু বেড়িয়ে এলো দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা চলে উনাদের মাঝে। সেই কথা বলা যে শেষ কথা বলা হবে, সেই দেখাই যে শেষ দেখা হবে তা দুজনের কেউ জানতো না। কেবলি মনের হাবিলাশ আরো কিছুক্ষণ কথা বলি, অন্তরার সাথে আরো কিছুক্ষণ একসাথে থাকি।
চলতে থাকলো কথা...

৮.
পরীক্ষা শেষের দিনটি ছিলো ১৫ মার্চ ২০১৬। তখন গোধূলি। মুহিদ ভাই উনার সম্পর্কে ছোট ভাই রহিমকে তড়িঘড়ি মটর বাইক নিয়ে আসতে বলেন।
রহিম বলল যাচ্ছি তবে কেন এতো তাড়া? জানতে পারি। ধরলাপাড়ে যাব, আয় তাড়াতাড়ি আয় মুহিদ ভাই বলল। রহিম বাইক নিয়ে এলো। মুহিদ ভাই পিছনে বসলেন। রহিম ড্রাইভ করছে। গাড়ি চলল ধরলার পানে। ধরলা পেড়িয়ে সামান্য দূরে মাদ্রাসা। মুহিদ ভাইরা সেদিকে গাড়ি রওনা করলেন। হঠাৎ দ্রুত স্পিডে একটি মাইক্রো পিছন থেকে মটর বাইকে ধাক্কা দেয়। বাইক ছিটকে পড়ে। রহিম ছিটকে রাস্তার নিচে পড়ে যান। মুহিদ ভাই উবুর হয়ে পড়ে যান পাকা রাস্তার উপড়। ঠাস্ করে একটি শব্দ হলো। মুহিদ ভাইয়ার মাথাটা ফেঁটে গেল। মুখ, কান ও নাক দিয়ে ফিনকে আসছে রক্ত। কপালের ফাঁটা অংশ দিয়ে প্রবল বেগে উষ্ম লাল টগবগে রক্ত রাস্তার বুকে ধরলার স্রোত সৃষ্টি করলো। মুহিদ ভাইয়ের শরীর ক্রমে বল শুণ্য হয়ে আসছে। আস্তা আস্তে অবয়বের বর্ণ ফেকাসে হয়ে পড়ছে। রক্তে রক্তাক্ত হয়ে ওঠলো মুহিদ ভাইয়ের শরীর। মুহূর্তেই জ্ঞান হারালেন মুহিদ ভাই। সুযোগ পেয়ে মাইক্রো চলে গেলো। রহিম ভাই অনেক কষ্টে উপড়ে উঠে আসলেন। মুহিদ ভাইয়ার বিভৎস্য রুপ দেখে চিৎকার করে ওঠলেন। সেই চিৎকারে প্রকম্পিত হলো ধরলার আকাশ বাতাস। লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠলো ধরলাপাড়। তখনো রক্ত গড়িয়ে চলছে মুহিদ ভাইয়ের। রহিম দ্রুত রিক্সায় করে মুহিদ ভাইকে নিয়ে যাচ্ছেন। পথি মধ্যে ভো ভো শব্দ করে মুহিদ ভাইয়ের পকেটের ফোনটি বেঁজে ওঠলো। রহিম ভাই দেখলেন অন্তরা আপুর ফোন। রিসিভ করলেন। সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। আর বললেন দ্রুত সদর হাসপাতালে আসেন। অন্তরা আপু পাগলীর মত করে ছুটলেন। প্রাথমিক চিকিৎসা হলো। কিন্তু মারাত্মক আশঙ্কা বোধ করে ডাক্টার রেপার্ট করলেন রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে। রংপুরে যাবার আগের মুহূর্ত সেই থেতলে যাওয়া রক্তাক্ত মুখের উপর স্নেহ ও প্রেমের শীতল চুমু দিলেন অন্তরা আপু। দুচোখে তার অঝড়ে জল পড়ছে। হাত নেড়ে নেড়ে বিদায় জানালেন। গাড়ি চললো রংপুরের দিকে। রংপুরে যাবার পর ১৫ মার্চ থেকে ২১ মার্চ মোট ৭ দিন পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকলেন মুহিদ ভাই। এরই মধ্যে তিনদিন তিনরাত অন্তরা আপু ঘুমহীন রংপুর মেডিকেলে অবস্থান করলেন। পরে ২০ মার্চ জরুরি কাজে চলে আসেন কুড়িগ্রামে। আসবার সময় দুহাতে কত আদর করে দিলেন মুহিদ ভাইকে। শেষে কপালে একটা চুমু দিয়ে চললেন কুড়িগ্রামের পথে। সেই ২০ মার্চ অন্তরা আপুর বেস্ট বান্ধবী মিতু আপু। যার সাথে অনেক অনেক আগে মুহিদ ভাইয়ের একটা ঠুনকো সম্পর্ক ছিলো। সেই সম্পর্কের দায়ভার যেন কত গুরুভার হয়ে ওঠলো মিতু আপুর কাছে। ছুটে চললেন কুড়িগ্রাম ছেড়ে রংপুরের পানে। তাহা অন্তরা আপু জানতোনা। অতঃপর ২১ মার্চ সকাল ৯টা বেজে ১৫ মিনিট। মুহিদ ভাই মৃত্যুর সহিত পাঞ্জা লড়তে লড়তে পরাজিত হলে পরপারে পাড়ি জমান। পৃথিবীর বুকে উনার নিঃশ্বাস শেষ হয়ে এলো। খেলা সমাপ্ত হলো তার। অশ্রু সজল শাহআলম ভাই মিতু আপুকে ফোন করে ব্যাপারটা খুলে বলেন। আরো বলেন মুহিদের লাশ নিয়ে যাচ্ছি তুমি অন্তরাকে নিয়ে কুড়িগ্রাম শাপলা চত্ত্বরে থাকিও। লাশের গাড়ি দ্রুত বেগে কুড়িগ্রামের পানে আসতে থাকলো...

৯.
হঠাৎ মিতু আপুর ফোন পেয়ে অন্তরা আপু আতকে ওঠে। ফোন রিসিভ করে বললেন কিরে ফোন করছিস কেন?
মিতু আপু তখন কাঁদতেছিলো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললেন-
অন্তরা মুহিদ ভাই আর নাই রে...
অন্তরা আপুর আর কথা নেই। সমস্ত ভাষা কে যেন হরণ করে নিলো। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরতে লাগলো। স্বচ্ছ আকাশ মেঘে ঢেকে গেলো। পুরো বিশ্ব আজ বিষিয়ে তুলছে অন্তরা আপুকে। চোখে অঝড় ধারায় জল পড়ছে। আজ প্রকৃতির সদা সত্য নিয়মকে ওনি মানতে নারাজ। বুক ফেঁটে যাচ্ছে। তবুও কাঁদতে পারেনা।
মিতু আপু এমতাবস্থায় উনার মেস থেকে অন্তরা আপুর কাছে ছুঁটে আসলেন। এবং তড়িঘড়ি রিক্সা নিয়ে শাপলা চত্ত্বরে চললেন। সেখানে আরো অনেক ছেলের ভিড়। ছেলেগুলো মিতু আপুর পরিচিত পরিচিত লাগছে। এই ছেলেগুলোতো তালতলায় দেখা যায়। হয়তো মেসের থেকে এসেছে। এমনি চিন্তা করলেন মিতু আপু। অতঃপর লাশের গাড়ি চলে এলো। সবাই ভিড় জমালো। কান্নায় ভরে গেল শাপলা চত্ত্বর। অন্তরা আপুকে জড়ায় নিয়ে মিতু আপু লাশের গাড়িতে ওঠলেন। কফিনের কাপড়ে জড়ানো লাশের মুখ উন্মচিত করলেন শাহআলম ভাই। অন্তরা আপু অঝড় নয়নে কাঁদতে লাগলেন। মুহিদ ভাইয়ের সমগ্র মুখমন্ডলে নরম হাতের ছোয়া দিলেন। তৎসময় অন্তরা আপুর কয়েক ফোঁটা অশ্রু মুহিদ ভাইয়ের কপালে পড়লে দুহাত দিয়ে সুন্দর করে তা কপালে মেখে দেন আপু। সেই অশ্রু সিক্ত কপালে কয়েকবার শেষ বারের মত চুমু দিয়ে নিলেন। পাশে মিতু আপু যারো ইচ্ছা হচ্ছিলো। কিন্তু সামাজিকতার বেড়া জালে তা হলো না। কেবল অশ্রু বিসর্জন দিয়ে গেলেন।
এদিকে অন্তরা আপু চিৎকার করে বলতে লাগলেন-
...ইয়া আল্লাহ এদৃশ্য দেখবার আগে
কেন আমাকে নিলেনা? ... কেন নিলেনা?
শাহআলম ভাই ও মিতু আপু দুজনে মিলে অন্তরা আপুকে গাড়ি থেকে নিচে নিলেন। অন্তরা আপুর কান্নার চিৎকার প্রতিটি চোখে অশ্রু ঝড়ায়েছিলো। হৃদয়গুলো বেদনার দংশনে চুরমার হচ্ছিলো। লাশের গাড়ি যাত্রাপুরের দিকে চলল। মুহিদ ভাইয়ার বাড়ির উদ্যেশ্যে। অন্তরা আপু মিতু আপুর হাত ছিটকে ছুটতে চাইলেন। মিতু আপু আরো শক্ত করে জড়ায় নিলেন অন্তরা আপুকে।
লাশের গাড়ি একটুে পড়েই দৃষ্টি ছেড়ে চলতে থাকলো। অন্তরা আপুর সমস্ত হৃদয় যেন শূণ্যতার হাহাকারে ভেঙ্গে পড়লো। যেন, সেই শূণ্য হৃদয় সমগ্র বিশ্বকে গুণ করে গ্রাস করতে চায়। আজ দুচোখের জলে ভালোবাসা সিক্ত হয়ে গেল। হাহাকার, শূণ্যতা যেন বিষিয়ে তুলছে উনার হৃদয়, উনার পৃথিবী। অন্তরা আপু আজ থেকে ভালোবাসার বিনিময়ে নিয়তির স্রষ্টার কাছ থেকে পেল একটি বিষাক্ত জীবন। যে জীবনের হৃদয় মাজারে অসহায় একটি মৃত ফুল পড়ে থাকলো। হৃদয়ের পবিত্র প্রেম চোখের জলে ছিপছিপ বৃষ্টির সাথে মিশে গেল। অন্তরা আপুর অন্তর জুড়ে থাকলো শুধু অতৃপ্তির হাহাকার...

১০.
ট্রেন রাজারহাট স্টেশন মাত্রই ছাড়লো। অন্তুর গল্প শেষ হলো। সে প্রকৃতির থেকে চোখ সরায়ে মন্তুর দিকে তাকালো। মন্তু কাঁদছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অন্তুরও দুচোখে জলের ভিড়। কাঁদ কাঁদ স্বরে অন্তু বলল,
এই মন্তু শান্ত হ...
মন্তু আরো বেশি পরিমানে কাঁদতে থাকলো। অন্তুরও তেমন অবস্থা। যেন মন্তুকে শামলাতে গিয়ে নিজেই বেশামাল হয়ে পড়লেন। তখন তাদের দুজনার কর্ণে ট্রের ঝকঝক শব্দ অন্তরা আপুর সুকুরুন কান্নার সুরের সাথে একত্ত্বতা ঘোষণা করে ভেসে আসছে। চারদিকে ধ্বনিত হচ্ছে -
...ইয়া আল্লাহ আমায় নিলেনা কেন? আমায় নিলেনা কেন?
তখনো ছিমছাম বৃষ্টি। ট্রেন কুড়িগ্রাম স্টেশনে এসে দাঁড়ালো। অন্তু দুহাত দিয়ে চোখের জল মুছে ট্রেনের লোহার পৃষ্টাগুলোয় আচড় কেটে দিলো। আর বিরবির করে মন্তুকে বলল-
...মুহিদ ভাইয়ের তরে এ বিশ্বের বুকে ভালোবাসার অশ্রু স্বাক্ষর রেখে গেলাম।
অতঃপর মন্তুকে উদ্যেশ্য করে অন্তু বলল চল দোস্ত...
তারা স্টেশনে ছিপছাপ বৃষ্টিতে দাঁড়ায়ে থাকলো। ট্রেন আবার ঝকঝক শব্দে চলতে শুরু করলো। কিছুক্ষেনের মধ্যেই ট্রেনটি সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে সীমানা পেরিয়ে ছুটলো...