![]() | ||
| আব্দুল খালেক ফারুক |
প্রাণ কুঠিরের নির্মাণ পর্ব-আব্দুল খালেক ফারুক
ক.
মাইকে উঁচু গ্রামে বাজছে অন্ধ বাউলের কাওয়ালি। পুকুর খুঁড়ছে জনা বিশেক শ্রমিক। গানের তালে তালে কোমর দুলিয়ে, সিটি বাজিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে কাজ করে যাচ্ছে তারা। কাজের সময় গান বাজনা থাকলে মেজাজ ফুরফুরে থাকে, দেহে অলসতা থাকে না- সেকথা করিম বকস মৃধা ভালই জানেন। তাই গঞ্জ থেকে ১৫০ টাকা দিন চুক্তি করে কাশেম মাইক সার্ভিসের মাইক আনিয়েছেন। মাইকে তখন বাজছে অন্ধ বাউলের কাওয়ালি-‘যবে তাসরিফ আনিলেন মুহাম্মদ, এ দুনিয়া হয়িল উজালা--।
নতুন বাড়ি করছেন মৃধা। তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর জন্যে। নির্মিয়মান বাড়ির লাগোয়া পুকুর। তাতে বাঁধাই করা ঘাট থাকবে। যাতে বিবি আয়েশ করে স্নান কর্ম সারতে পারে। ষাট বছর বয়সে., জীবনের পড়ন্ত বেলায় মৃধা জবরদস্ত একখান চমক দিয়েছেন। গ্রামবাসীরা এ নিয়ে হাসাহাসি কানাকানি করছে।
মাইকে উঁচু গ্রামে বাজছে অন্ধ বাউলের কাওয়ালি। পুকুর খুঁড়ছে জনা বিশেক শ্রমিক। গানের তালে তালে কোমর দুলিয়ে, সিটি বাজিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে কাজ করে যাচ্ছে তারা। কাজের সময় গান বাজনা থাকলে মেজাজ ফুরফুরে থাকে, দেহে অলসতা থাকে না- সেকথা করিম বকস মৃধা ভালই জানেন। তাই গঞ্জ থেকে ১৫০ টাকা দিন চুক্তি করে কাশেম মাইক সার্ভিসের মাইক আনিয়েছেন। মাইকে তখন বাজছে অন্ধ বাউলের কাওয়ালি-‘যবে তাসরিফ আনিলেন মুহাম্মদ, এ দুনিয়া হয়িল উজালা--।
নতুন বাড়ি করছেন মৃধা। তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর জন্যে। নির্মিয়মান বাড়ির লাগোয়া পুকুর। তাতে বাঁধাই করা ঘাট থাকবে। যাতে বিবি আয়েশ করে স্নান কর্ম সারতে পারে। ষাট বছর বয়সে., জীবনের পড়ন্ত বেলায় মৃধা জবরদস্ত একখান চমক দিয়েছেন। গ্রামবাসীরা এ নিয়ে হাসাহাসি কানাকানি করছে।
খ.
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর অন্তর্ধানের প্রায় যুগপূর্তি হয়েছে। তার দু' ছেলে দু' মেয়ে আছে। মৃধা এই গ্রামের সবচে সম্পদশালী ব্যক্তি। ৫০ বিঘা ধানি জমি। গঞ্জে দু'টি বাসা বাড়ি। বড় ছেলেটা সাব রেজিষ্টার। ছোটটি রড সিমেন্টের ব্যবসা করে ভালই চলছে। দু' জনে বিয়ে থা করেছে। তাদের ঘরে সন্তান সন্ততি রয়েছে। পুত্র পুত্র বধূ আর নাতি-নাতনি নিয়ে মৃধা বেশ সুখেই দিন গুজরান করছিলেন।
অবশ্য মাঝে মাঝে অচিন এক শূন্যতা বরফের মতো জমাট বাঁধতো তার মনে। সবই আছে। তবুও কী যেন নেই। লালনগীতি গাইতে ইচ্ছে করে। দ্বারা পুত্র পরিবার-আমি কার? কে আমার? মৃধার মনে পড়ে যৌবনের দুরন্ত দিনগুলোর কথা। বহু বছর আগে হাড়কাঁপানো পৌষের এক রাতে অচেনা এক নারীকে শাদি করে ঘরে তুলেছিল মৃধা। ছমিরণের চাঁদমুখখানি মনে পড়তেই মৃধার সবকিছু কেমন জানি অবিন্যস্ত হয়ে যায়। তবে দ্বিতীয় বিয়ের কথা তার মনে হয়নি কখনও। কিন্তু বিধির বিধান বলে কথা। গঙ্গার হাটে ভাতিজার জন্যে কনে দেখতে গিয়ে মৃধা ষাট বছর বয়সে মস্ত এক ঘা খেলেন মনে। তিনি বন্দি হলেন এক মায়ার খাঁচায়। মেয়েটির মধ্যে ছমিরণের মুখচ্ছবি দেখে তিনি প্রথমে আৎকে উঠে পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে স্মৃতিময় চেনাবৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলেন।
মেয়েটির নাম কমলা। কমলা সুন্দরী। বাহারী নাম। গালে সুন্দর তিল। টানা টানা চোখ। নির্জলা সুন্দরী যাকে বলে। গরীবের ঘরে জন্মেছেন বলে হয়তো অপ্সরীর এমন অনাদর। প্রথম দেখাতেই মৃধা প্রেমে পড়ল মেয়েটির। খোঁজ নিয়ে জানলেন বছর খানেক আগে মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামীটি এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হবার পর শ্বশুরবাড়িতে আর টিকতে পারেননি। ওরা দুর দুর করে তারিয়ে দিয়েছে হতভাগিকে। মেয়ের দুর্ভাগ্যের কাহিনী শোনাতে শোনাতে বাবা জহুর আলীর দু' চোখে দু’ চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। ক্ষানিক নিরব থেকে আবার বলতে শুরু করেন দু:খী মেয়েটির কথা। শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকে মনমরা থাকে মেয়েটি। সুন্দরী মেয়ে ঘরে রাখা বিপদজনক। তাই মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজছেন তিনি।
আদ্যপান্দ্য শুনে মৃধা নিশ্চুপ হয়ে ক্ষাণিক কি যেন ভাবলেন। মায়াবতি মোহিনীর জালে বন্দি হলেন তিনি। তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেন কমলাকে নিকাহ করবেন তিনি। এই দু:খী মেয়েটিকে দু:খপুরি থেকে উদ্ধার করবেন তিনি। ওর দু:খের অংশীদার হয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবেন।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর অন্তর্ধানের প্রায় যুগপূর্তি হয়েছে। তার দু' ছেলে দু' মেয়ে আছে। মৃধা এই গ্রামের সবচে সম্পদশালী ব্যক্তি। ৫০ বিঘা ধানি জমি। গঞ্জে দু'টি বাসা বাড়ি। বড় ছেলেটা সাব রেজিষ্টার। ছোটটি রড সিমেন্টের ব্যবসা করে ভালই চলছে। দু' জনে বিয়ে থা করেছে। তাদের ঘরে সন্তান সন্ততি রয়েছে। পুত্র পুত্র বধূ আর নাতি-নাতনি নিয়ে মৃধা বেশ সুখেই দিন গুজরান করছিলেন।
অবশ্য মাঝে মাঝে অচিন এক শূন্যতা বরফের মতো জমাট বাঁধতো তার মনে। সবই আছে। তবুও কী যেন নেই। লালনগীতি গাইতে ইচ্ছে করে। দ্বারা পুত্র পরিবার-আমি কার? কে আমার? মৃধার মনে পড়ে যৌবনের দুরন্ত দিনগুলোর কথা। বহু বছর আগে হাড়কাঁপানো পৌষের এক রাতে অচেনা এক নারীকে শাদি করে ঘরে তুলেছিল মৃধা। ছমিরণের চাঁদমুখখানি মনে পড়তেই মৃধার সবকিছু কেমন জানি অবিন্যস্ত হয়ে যায়। তবে দ্বিতীয় বিয়ের কথা তার মনে হয়নি কখনও। কিন্তু বিধির বিধান বলে কথা। গঙ্গার হাটে ভাতিজার জন্যে কনে দেখতে গিয়ে মৃধা ষাট বছর বয়সে মস্ত এক ঘা খেলেন মনে। তিনি বন্দি হলেন এক মায়ার খাঁচায়। মেয়েটির মধ্যে ছমিরণের মুখচ্ছবি দেখে তিনি প্রথমে আৎকে উঠে পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে স্মৃতিময় চেনাবৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলেন।
মেয়েটির নাম কমলা। কমলা সুন্দরী। বাহারী নাম। গালে সুন্দর তিল। টানা টানা চোখ। নির্জলা সুন্দরী যাকে বলে। গরীবের ঘরে জন্মেছেন বলে হয়তো অপ্সরীর এমন অনাদর। প্রথম দেখাতেই মৃধা প্রেমে পড়ল মেয়েটির। খোঁজ নিয়ে জানলেন বছর খানেক আগে মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বামীটি এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হবার পর শ্বশুরবাড়িতে আর টিকতে পারেননি। ওরা দুর দুর করে তারিয়ে দিয়েছে হতভাগিকে। মেয়ের দুর্ভাগ্যের কাহিনী শোনাতে শোনাতে বাবা জহুর আলীর দু' চোখে দু’ চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। ক্ষানিক নিরব থেকে আবার বলতে শুরু করেন দু:খী মেয়েটির কথা। শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকে মনমরা থাকে মেয়েটি। সুন্দরী মেয়ে ঘরে রাখা বিপদজনক। তাই মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজছেন তিনি।
আদ্যপান্দ্য শুনে মৃধা নিশ্চুপ হয়ে ক্ষাণিক কি যেন ভাবলেন। মায়াবতি মোহিনীর জালে বন্দি হলেন তিনি। তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেন কমলাকে নিকাহ করবেন তিনি। এই দু:খী মেয়েটিকে দু:খপুরি থেকে উদ্ধার করবেন তিনি। ওর দু:খের অংশীদার হয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবেন।
বাড়ি ফিরেই মৃধা খবর দিলেন সাদু মিয়াকে। ঘটক সাদু মিয়ার কাছে মনোবাঞ্চা প্রকাশ করলেন। কাজটার গোপনীয়তার বিষয়টিও বোঝালেন তাকে। সাদু মিয়া আকলমন্দ আদমী। তাই ইশারায় কাফি হয়ে গেল। ঘটক হিসেবে এ অঞ্চলে সাদু মিয়ার বিস্তর নাম ডাক। প্রবাদ আছে যে শিকারীর তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে। কিন্তু সাদু মিয়ার নিশানা অব্যর্থ। তো সাদু মিয়া মেয়ে পক্ষের কাছে প্রস্তাব পেশ করলেন। কিন্তু জহুর আলী প্রথমে রাজী হলেন না। মৃধা একেতো বিত্তশালী তার উপর বৃদ্ধ। জোয়ান মেয়ের সাথে কী করে সম্ভব এমন সম্মন্ধ?। কিন্তু সাদু নাছোরবান্দা। মোটা অংকের অর্থের লোভ দেখিয়ে শেষতক জহুর আলীকে তিনি পটাতে সক্ষম হন।
বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হলো। ফাল্গুনের এক তারিখ। বসন্তের প্রথম দিন। মৃধার জীবনেও বসন্ত এসেছে সায়াহৃকালে নি:শব্দে। বিয়ের আগে যেন কাকপক্ষীও টের না পায় সে ব্যাপারে মৃধার পাকা ব্যবস্থা। ফাল্গুনের এক তারিখে রাতে আকাশ বেশ পরিষ্কার-নীলাভ। চাঁদ ছড়িয়ে দিচ্ছে দুধেল জোৎস্না অকৃপন। অগুণতি তারার মেলা আকাশ জুড়ে। চরাচরে আলোর বন্যা। কৃষ্ণচ’ড়ার মোহন গন্ধে বাতাস ফুঁড়ে ছুটে আসছে। ফুরফুরে হাওয়ায় মৃধার মন আনচান করে। মৃধা যেন এক লাফে পঁচিশ বছরের যুবক হয়ে যান। রাতের খাবারের পর সবাই যখন ঘুমের এন্তজামে ব্যস্ত। তখনই সুরৎ করে মৃধা বেড়িয়ে পড়েছিলেন বাড়ি থেকে। তারপর ছৈ তোলা গরুর গাড়িতে মৃধা বরযাত্রী সেজে রওয়না দিয়েছেন নিশিরাতে। মৃধার সাথে রয়েছে তিন সদস্যের বরযাত্রী। সাদু ঘটক ছাড়াও আছেন ইজ্জত মুন্সি। নিকাহ পড়ার জন্য বিশ্বস্ত মুন্সিকেই সংগে নিলেন তিনি। মুন্সি অবশ্য বিয়ে পড়ানোর জন্য দু'শ টাকা হাদিয়া নেন। কিন্তু মৃধার গ্যাঞ্জামের বিয়ে। তাই কিছু বকশিশের ব্যবস্থা হয়তো থাকবে। চতুর মুন্সির বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাই প্রস্তাব পেয়ে লাভ দিয়ে উঠেছেন গরুর গাড়িতে।
আর আছেন শরফউদ্দিন। মৃধার বাল্যবন্ধু। বয়স পঞ্চাশ কী ষাট হবে। মুখে কাঁচা পাকা দাঁড়ি। সারামুখে গুটি বসন্তের দাগ। পঁচিশ বছর বয়সে একবার বেচারা গুটি বসন্তের কোপানলে পড়ে পড়ি-মরি করে বেঁচে আছেন। অবশ্য গুটি বসন্ত বিদায় নিলেও সারামুখে রয়েছে তার অবিনাশী চিহৃ। সে দিক দিয়ে মৃধাকে আজ বেশ জৌলুসময় লাগছে। চোষ পা-জামার সাথে নকশা আঁকা পাঞ্জাবী , মাথায় পুরানো জিন্নাহ্ টুপি। চেহারার মধ্যে অনায়াসে নূরাণী-নূরাণীভাব চলে এসেছে। মৃধা বসে আছেন গাড়ির সামনে পদ্মাসনের ভঙ্গিমায়। গাড়োয়ানের ক্ষাণিকটা পিছনে।
চাঁদনী রাত। গরুর গাড়ি চলছে সন্তর্পণে। গাড়োয়ান মাঝে মধ্যে ডান-বাম-হা-হু করে গরুকে পরিচালনা করছে। গাড়োয়ান এক সময় তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে গান ধরে পাগল মন.....। কিন্তু না-মুন্সি থামিয়ে দেয় গাড়োয়ানের দরাজ কন্ঠ। পবিত্র যাত্রায় বেশরিয়তি কর্ম করতে নাই। মুন্সি রাগে গজরাতে থাকে। মৃধা কিছু বলে না। তার চোখে কমলা বিবির রুপ জ্যোতি বাঁধনহারা সমুদ্রের মত উচ্ছলে পড়ছে। মুন্সি দশ-পনের মিনিট পরপর সবাইকে আতর বিতরণ করছে। গাড়োয়ানকে একটু বেশী মাত্রায় আতর দিয়ে সর্বাঙ্গ পবিত্র করার হুকুম জারী করে মুন্সি। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মুন্সি জিহ্বার অতি ব্যবহার শুরু করে। “ভাইজান আজকার রাতটা আপনের জীবনের পবিত্র রাত। আল্লাহ তালার খাস নেয়ামত আপনার উপর নাযেল হয়েছে। এ সময় আতর মেখে পবিত্র থাকা ভাল। জিনিসটা অবশ্য দেশি না। বড় ভাগ্নেটা পেশোয়ারে থাকে-ওকে ফরমায়েশ দিয়ে আতরটা আনিয়াছি। ভাইজান গন্ধটা বড় মধুর তাই না”।
“মুন্সি সাব আপনের হাতে পইড়া গন্ধটা আরো কড়া হইছে। ” সাদু ঘটক বিরক্ত হয়ে গেল বলে। মুন্সি বাচাল প্রকৃতির । অনর্গল কথা বললেও তার চোপা ব্যাথা করে না। বরং বেশীক্ষণ চুপ থাকলে নাকি তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মিনিট খানেক বিরতি দিয়ে মুন্সি মৃধাকে সুধায়- “ ভাইজান আপনের হবু বিবির চেহারা-সুরত-আচার সম্পর্কে কিছু বললেন নাতো ।
“সে আর আমি কি বলব। আপনেরা নিজ চোক্ষে দেইখ্যা বিচার করবেন। তয় আমি শুধু এইটুকু কইতে পারি বাপের জন্মেও এমন আওরাত চোক্ষে দেখি নাই।”
মাশাল্লাহ। আল্লাহর কি কুদরত। খুব সুরত চেহারা। সাক্ষাত বিবি হাওয়া। তা না হইলে শ্যাষ বয়সে আপনের কি এমন ভীমরতি হয়?” একথায় ক্ষেপে যায় শরফউদ্দিন।
“মুন্সি সাব আপনের হাতে পইড়া গন্ধটা আরো কড়া হইছে। ” সাদু ঘটক বিরক্ত হয়ে গেল বলে। মুন্সি বাচাল প্রকৃতির । অনর্গল কথা বললেও তার চোপা ব্যাথা করে না। বরং বেশীক্ষণ চুপ থাকলে নাকি তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মিনিট খানেক বিরতি দিয়ে মুন্সি মৃধাকে সুধায়- “ ভাইজান আপনের হবু বিবির চেহারা-সুরত-আচার সম্পর্কে কিছু বললেন নাতো ।
“সে আর আমি কি বলব। আপনেরা নিজ চোক্ষে দেইখ্যা বিচার করবেন। তয় আমি শুধু এইটুকু কইতে পারি বাপের জন্মেও এমন আওরাত চোক্ষে দেখি নাই।”
মাশাল্লাহ। আল্লাহর কি কুদরত। খুব সুরত চেহারা। সাক্ষাত বিবি হাওয়া। তা না হইলে শ্যাষ বয়সে আপনের কি এমন ভীমরতি হয়?” একথায় ক্ষেপে যায় শরফউদ্দিন।
'আরে মিয়া খালি বয়স বয়স করতেছো। মৃধার যা বয়স আরো হাফ ডজন বউরে হজম করার ক্ষমতা তার আছে।' সাদুও যোগ দেয় এ পর্বে।
'মুন্সি সাব আপনে দেহি কিছৃুই জানেন না। আরে দুই কিসিমের মানুষের বয়স মুখের উপর কইতে নাই।'
'কোন দুই কিসিম?'
'মাইয়া মানুষ আর বুড়াইড়্যা বরের বয়স।' সাদুর একথায় হুস হয় মুন্সির। মৃধা কোন কারণে বিরক্ত হলে বকশিশের অংকটা কমতে পারে। মুন্সির মনে চট করে কথাটা মনে আসে। সুবিধা করতে না পারায় মুন্সি মৌনতা অবলম্বন করে। বরযাত্রী পৌঁছে গেছে কনের বাড়ির কাছে। বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখা গেল গেটের সামনে ঝুলছে “ শুভ বিবাহ”। পাড়ার কম বয়সী ছোকরাদের কর্ম। রাস্তার দু’ধারে দু’টি কলা গাছ পুঁতে রাখা হয়েছে। বাঁশের চাটাই রংধনুর মত বাঁকিয়ে কলাগাছে বেঁধে দেয়া হয়েছে। রঙিন কাগজ আর খবরের কাগজে ঢেকে দেয়া হয়েছে চাটাইয়ের শরীর। তা সত্তেও চাটাই তার অস্বিত্ব জানান দিচ্ছে স্বগর্বে। গেটের সামনে সাদা কাগজে লেখা 'শুভ বিবাহ' গেট মুল্য ১০০১ টাকা। জনা দশেক কম বয়সী ছোকরা মোমবাতি জ্বেলে টেবিলে পান বিড়ি রেখে পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম দেশে বিয়ে বাড়ির এক অপরিহার্য চিত্র। অবশ্য গেট পর্বে দু’পক্ষের তর্কযুদ্ধ বিয়ে সংস্কৃতির অংশ। মৃধা অবশ্য দর কষাকষির সুযোগ দিলেন না । সময় কম। রাতেই বাড়ি ফিরতে চান তিনি। পাঁচশ টাকার একটি নোট ছোকরাদের হাতে দিয়ে সোজা অন্দরে গেলেন মৃধা।
উঠোনে ফরাস বিছিয়ে নিকাহ্ পড়ানো শুরু হলো। হ্যাজাক বাতির আলো ঠিকরে পড়ছে সমগ্র উঠোন জুড়ে। ঘরের ভেতর মিহিন কন্ঠে কান্নার শব্দ পেল মৃধা। চেনা কণ্ঠের উচ্চারণে চমকে ওঠেন তিনি। কান্নার মধ্যে ছন্দ আছে। সুর আছে। আচ্ছন্নতার অলীক জগতে তিনি ঢুকে পড়ে ক্ষাণিকটা সময়। মৃধা বুঝতে পারেন- এই মোহন সুরের মায়াজালে আটকা পড়ে গেছে সে। নিকাহ পড়ানো শেষে মুন্সি নব-দম্পতির দীর্ঘায়ু কামনা করে দীর্ঘ মোনাজাত করলেন। বকশিসের অংক বাড়ানোও তার মাথায় ছিল। ক্ষুদ্র আনুষ্ঠানিকতার পর খানাপিনার এন্তেজাম করতে দেখে মুন্সির উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। উশখুশ করে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। অন্য কোথাও হলে মোনাজাতের আগেই তার প্রাপ্য হাদিয়া বুুঝে নিতেন। কিন্তু মৃধাকে তো সেভাবে বলা যায় না। আবার সংশয় ভর করে তার উপর। যদি খানাপিনার উপর দিয়ে পাড়ি দিতে চায় মৃধা? চিন্তায় ঘামতে থাকেন। মুন্সির বেগতিক অবস্থা বুঝাতে পেরে শরফউদ্দিন মৃধার কানে কানে কি যেন বলে। মৃধা পকেট থেকে একশ টাকার দু’টো নোট বের করে ছুঁড়ে দেন মুন্সির দিকে। মুন্সি দ্রুত তা পকেটে চালান করে। মুন্সির মুখে তৃপ্তির হাসি। হলদে দাঁত এবড়ো থেবড়ো বেড়িয়ে পড়ছে মারিশুদ্ধ। মুন্সি পকেট থেকে আবার আতর বের করে আর একবার সবাইকে বিতরণ করে। নিজেও সিনায় লাগায়!
'মুন্সি সাব আপনে দেহি কিছৃুই জানেন না। আরে দুই কিসিমের মানুষের বয়স মুখের উপর কইতে নাই।'
'কোন দুই কিসিম?'
'মাইয়া মানুষ আর বুড়াইড়্যা বরের বয়স।' সাদুর একথায় হুস হয় মুন্সির। মৃধা কোন কারণে বিরক্ত হলে বকশিশের অংকটা কমতে পারে। মুন্সির মনে চট করে কথাটা মনে আসে। সুবিধা করতে না পারায় মুন্সি মৌনতা অবলম্বন করে। বরযাত্রী পৌঁছে গেছে কনের বাড়ির কাছে। বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখা গেল গেটের সামনে ঝুলছে “ শুভ বিবাহ”। পাড়ার কম বয়সী ছোকরাদের কর্ম। রাস্তার দু’ধারে দু’টি কলা গাছ পুঁতে রাখা হয়েছে। বাঁশের চাটাই রংধনুর মত বাঁকিয়ে কলাগাছে বেঁধে দেয়া হয়েছে। রঙিন কাগজ আর খবরের কাগজে ঢেকে দেয়া হয়েছে চাটাইয়ের শরীর। তা সত্তেও চাটাই তার অস্বিত্ব জানান দিচ্ছে স্বগর্বে। গেটের সামনে সাদা কাগজে লেখা 'শুভ বিবাহ' গেট মুল্য ১০০১ টাকা। জনা দশেক কম বয়সী ছোকরা মোমবাতি জ্বেলে টেবিলে পান বিড়ি রেখে পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম দেশে বিয়ে বাড়ির এক অপরিহার্য চিত্র। অবশ্য গেট পর্বে দু’পক্ষের তর্কযুদ্ধ বিয়ে সংস্কৃতির অংশ। মৃধা অবশ্য দর কষাকষির সুযোগ দিলেন না । সময় কম। রাতেই বাড়ি ফিরতে চান তিনি। পাঁচশ টাকার একটি নোট ছোকরাদের হাতে দিয়ে সোজা অন্দরে গেলেন মৃধা।
উঠোনে ফরাস বিছিয়ে নিকাহ্ পড়ানো শুরু হলো। হ্যাজাক বাতির আলো ঠিকরে পড়ছে সমগ্র উঠোন জুড়ে। ঘরের ভেতর মিহিন কন্ঠে কান্নার শব্দ পেল মৃধা। চেনা কণ্ঠের উচ্চারণে চমকে ওঠেন তিনি। কান্নার মধ্যে ছন্দ আছে। সুর আছে। আচ্ছন্নতার অলীক জগতে তিনি ঢুকে পড়ে ক্ষাণিকটা সময়। মৃধা বুঝতে পারেন- এই মোহন সুরের মায়াজালে আটকা পড়ে গেছে সে। নিকাহ পড়ানো শেষে মুন্সি নব-দম্পতির দীর্ঘায়ু কামনা করে দীর্ঘ মোনাজাত করলেন। বকশিসের অংক বাড়ানোও তার মাথায় ছিল। ক্ষুদ্র আনুষ্ঠানিকতার পর খানাপিনার এন্তেজাম করতে দেখে মুন্সির উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। উশখুশ করে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। অন্য কোথাও হলে মোনাজাতের আগেই তার প্রাপ্য হাদিয়া বুুঝে নিতেন। কিন্তু মৃধাকে তো সেভাবে বলা যায় না। আবার সংশয় ভর করে তার উপর। যদি খানাপিনার উপর দিয়ে পাড়ি দিতে চায় মৃধা? চিন্তায় ঘামতে থাকেন। মুন্সির বেগতিক অবস্থা বুঝাতে পেরে শরফউদ্দিন মৃধার কানে কানে কি যেন বলে। মৃধা পকেট থেকে একশ টাকার দু’টো নোট বের করে ছুঁড়ে দেন মুন্সির দিকে। মুন্সি দ্রুত তা পকেটে চালান করে। মুন্সির মুখে তৃপ্তির হাসি। হলদে দাঁত এবড়ো থেবড়ো বেড়িয়ে পড়ছে মারিশুদ্ধ। মুন্সি পকেট থেকে আবার আতর বের করে আর একবার সবাইকে বিতরণ করে। নিজেও সিনায় লাগায়!
সুবেহ সাদিকের সময় বরযাত্রী এসে পৌঁছে মৃধার বাড়িতে। তখনও রাতের সুনসান-নিরবতা কাটেনি। ভোরের পাখীরা গাইছে থেমে থেমে। মসজিদে মোয়াজ্জিন ফজরের আজান দিচ্ছে মধুর সুরে। আসসালাতু খায়রুম মিনান্নহ..। মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের পাতা দুলে ওঠে। একধরণের আধ্যাত্বিক আচ্ছন্নতা বিরাজ করছে চারপাশে। মৃধার ধারণা ছিল তার সন্তানদের মধ্যে পিতৃভক্তি প্রবল। সুতরাং বৃদ্ধ বয়সে তিনি যা করছেন সন্তানরা তাতে ক্ষুদ্ধ হলেও সরব প্রতিবাদ করবে না। কিন্তু অবস্থার বৈপরিত্যে তিনি বিস্ময়ে হতবাক। দু’ছেলে পারেতো লাঠি হাতে তেড়ে এসে মৃধাকে লাঠি পেটা করে। কমলা বিবি নিতান্ত সরলা গ্রাম্য মেয়ে। বিয়েতে তার অমত থাকলেও বাবার অনুশাসন আর দুর্ভাগ্যের কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া তার গত্যন্তর ছিল না। কিন্তু এখানে এমনতরো পরিস্থিতিতে নিজের অদৃষ্টের প্রতি তীব্র ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে তার। ছেলেরা সাফ সাফ ঘোষণা দিয়েছে বউ নিয়ে এ বাড়িতে মৃধার প্রবেশ নিষেধ। তিনি ইচ্ছে করলে অন্যত্র ডেরা বাঁধতে পারেন।
আবহাওয়া প্রতিকুল দেখে ইতিমধ্যে সাধু ঘটক অদৃশ্য হয়েছে। কিন্তু বন্ধু শরফউদ্দিন মৃধাকে ফেলে যেতে পারছে না। সে একবার ছেলেদের কাছে একবার মৃধার কাছে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে সে। কিন্তু বিবাদমান দু’পক্ষকে কিছুতেই সমঝোতায় আনতে পারছে না। মৃধা বলে দিয়েছেন নতুন বউ ঘরে তুললেও ছেলেদের তিনি বঞ্চিত করবেন না। কিন্তু ছেলেরা তাতে আমল দিচ্ছে না। ছেলেদের ধারণা নতুন বিবির ঘরে সন্তান-সন্তাদি আসলে পৈতিক সম্পত্তির অংশ অহেতুক কমে যাবে। ছেলে বউরা ছেলেদের কানভারী করে সে কথাই তাদের মনে বদ্ধমূল করে দিয়েছে। ছেলে বউরাই যে নেপথ্যে কলকাটি নাড়ছে মৃধা সেটা বুঝতে পারে। রাগে-দুঃখে মৃধার ঠোঁট কাঁপে। কপালে মৃদু ভাঁজ-দুশ্চিন্তার রেখা। এই বিপদের সময় তিনি অসীম ধৈর্য্যের পরিচয় দেন। মান-সম্মান অক্ষুন্ন রেখে আগে ঘরে ঠাঁই পেতে চান তিনি। শরফউদ্দিন অবশ্য ছেলেদের মনোভাব বুঝতে পেরেছে। এক অদ্ভুত প্রস্তাব পেশ করে ছেলেদের কাছে শরফউদ্দিন। নোতুন বউয়ের ঘরে যাতে সন্তান-সন্তাদি না আসে তার জন্য প্রয়োজনে মৃধাকে বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। কিন্তু এ প্রস্তাবটিকেও ছেলেরা নাকচ করে দেয়। দিনের আলো উদ্ভাসিত হবার সাথে সাথে গ্রামের লোকজন আস্তে-ধীরে ভীড় করতে শুরু করে। মৃধার শুভাকাংখীদের সংখ্যাও বেড়ে যায়। কেলেংকারীর ভয়ে শেষতক ছেলেরা বউ ঘরে তোলার অনুমতি দেয়।
গ.
ইতিমধ্যে দু’বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কমলা বিবির গর্ভে মৃধার ঔরষজাত সন্তান। তার বর্ধিষ্ণু গতি। কিন্তু মৃধার উদ্বেগ উৎকন্ঠা বেড়েছে হঠাৎ করে। ছেলেরা এই নবজাতকের আগমন কি মেনে নিবেন? আল্লাহ না করুক তার অবর্তমানে কি হবে তার প্রাণেশ্বরীর? ভাবনায় ঘুম আসে না চোখে। গ্রামবাসীরা এ নিয়ে কানাকানি ও সরস গুঞ্জনে মেতে উঠেছে। মৃধা অবশ্য এসব থোড়াই কেয়ার করে। লোকের কথায় তার কিছুই আসে যায়না। কিন্তু ফ্যাকরা বাঁধিয়েছে তার ছেলেরা। তারা এখন অব্ধি পিতৃদেবের এই বার্ধক্য প্রণয় মেনে নিতে পারেনি। এ নিয়ে পিতা বনাম পুত্রমহল কয়েকদফা বাকযুদ্ধ হয়ে গেছে। মৃধার নাতি নাতনীরাই যেখানে বিয়ের লায়েক হয়েছে সেখানে এই বয়সে মৃধার এমন ভীমরতি কিছুই হজম করতে পারছেনা ছেলেরা। ছেলেদের তো তিনি বলতে পারেন না বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে। এ ধরণের তীর ছুড়লে বুমেরাং হবার সম্ভাবনা আছে। সেটা মৃধা ভাল ভাবেই জানে। শেষ বয়সে ছেলে বউদের ঘাড় ধাক্কা খেয়ে বেইজ্জত হবার প্রয়োজন কী? হাজার হোক গ্রামে তার একটা প্রতিপত্তি আছে। অর্থশালী বলে লোকে একটু বাড়তি খাতির- তোয়াজ করে। তাই নীরবে সয়ে যাচ্ছেন ছেলে বউদের লাঞ্চনা-গঞ্চনা।
তিনি পৃথক বাড়ি করবেন। অন্ততঃ তার প্রাণেশ্বরীর জন্য। তিনি জীবিত থাকতেই একটা বন্দোবস্ত করে যেতে পারলে পরওয়ার দিগারকে কি জবাব দিবেন?
ইতিমধ্যে দু’বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কমলা বিবির গর্ভে মৃধার ঔরষজাত সন্তান। তার বর্ধিষ্ণু গতি। কিন্তু মৃধার উদ্বেগ উৎকন্ঠা বেড়েছে হঠাৎ করে। ছেলেরা এই নবজাতকের আগমন কি মেনে নিবেন? আল্লাহ না করুক তার অবর্তমানে কি হবে তার প্রাণেশ্বরীর? ভাবনায় ঘুম আসে না চোখে। গ্রামবাসীরা এ নিয়ে কানাকানি ও সরস গুঞ্জনে মেতে উঠেছে। মৃধা অবশ্য এসব থোড়াই কেয়ার করে। লোকের কথায় তার কিছুই আসে যায়না। কিন্তু ফ্যাকরা বাঁধিয়েছে তার ছেলেরা। তারা এখন অব্ধি পিতৃদেবের এই বার্ধক্য প্রণয় মেনে নিতে পারেনি। এ নিয়ে পিতা বনাম পুত্রমহল কয়েকদফা বাকযুদ্ধ হয়ে গেছে। মৃধার নাতি নাতনীরাই যেখানে বিয়ের লায়েক হয়েছে সেখানে এই বয়সে মৃধার এমন ভীমরতি কিছুই হজম করতে পারছেনা ছেলেরা। ছেলেদের তো তিনি বলতে পারেন না বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে। এ ধরণের তীর ছুড়লে বুমেরাং হবার সম্ভাবনা আছে। সেটা মৃধা ভাল ভাবেই জানে। শেষ বয়সে ছেলে বউদের ঘাড় ধাক্কা খেয়ে বেইজ্জত হবার প্রয়োজন কী? হাজার হোক গ্রামে তার একটা প্রতিপত্তি আছে। অর্থশালী বলে লোকে একটু বাড়তি খাতির- তোয়াজ করে। তাই নীরবে সয়ে যাচ্ছেন ছেলে বউদের লাঞ্চনা-গঞ্চনা।
তিনি পৃথক বাড়ি করবেন। অন্ততঃ তার প্রাণেশ্বরীর জন্য। তিনি জীবিত থাকতেই একটা বন্দোবস্ত করে যেতে পারলে পরওয়ার দিগারকে কি জবাব দিবেন?
ক’দিন ধরে কথাগুলো বারবার মাথায় আসছে মৃধার। গত রাতের এক অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। স্বপ্নটা এ রকম- তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তার লাশ ঘিরে গ্রামবাসীর জটলা। বিবি কমলার মর্মভেদী আর্তনাদ। বড় ছেলে এই অবস্থায় কমলা বিবির ঘাড় ধরে হির হির করে ঠেলে দিলেন বাড়ির বাইরে। তিনি কফিনের ভেতর থেকে বিবির বিলাপ শুনছেন। অন্তর্জ্বালায় পুড়ছেন কেবলই। কিন্তু তার কী সাধ্য আছে প্রতিকারের? তিনি যে এখন অন্য ভূবনের বাসিন্দা। ছেলেদের দিব্যি দিচ্ছেন অনবরত-কিন্তু কেউতো শুনছে না তার কথা। চোখের জলে মৃধার দাড়ি ভিজে একাকার। মাঝ রাতে সোয়ামীর এই কীর্তন শুনে বিবিও হকচকিত।
‘কি হইছে তোমার? অমন কইর্যা কান্দো ক্যান?
এতক্ষণে মৃধা বুজল তিনি খোয়াবের দেশে ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু খোয়াবের কথা বিবিকে বলা উচিৎ হবেনা। শিয়রে রাখা ‘ ছহি খাবনামা’ বইটি বের করে তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। কিন্তু না এই কিসিমের খোয়াবের কোন সমাধান খুঁজে পেলেন না। ভয়ে তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ। মৃধা ইশারায় বিবিকে পানি আনতে বলে। দু’গ্লাস পানি ঢকঢক করে সাবাড় করে কিছুটা ধাতস্থ হলেন তিনি।
“ কি হইছে-অমন করতাছো ক্যান গো?”
“না-কিছু না! খোয়াবে একজন কামেল লোকরে দ্যাখলাম।” মিথ্যে বলে মৃধা-সত্যকে চাপা দিতে। মৃধা সে রাতেই সিদ্ধান্ত নিলেন। রাত পোহালেই তিনি মজুর নিয়ে নতুন বাড়ির কাজ শুরু করবেন। বাড়ির নাম দিবেন “ প্রাণ কুঠির”।
‘কি হইছে তোমার? অমন কইর্যা কান্দো ক্যান?
এতক্ষণে মৃধা বুজল তিনি খোয়াবের দেশে ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু খোয়াবের কথা বিবিকে বলা উচিৎ হবেনা। শিয়রে রাখা ‘ ছহি খাবনামা’ বইটি বের করে তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। কিন্তু না এই কিসিমের খোয়াবের কোন সমাধান খুঁজে পেলেন না। ভয়ে তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ। মৃধা ইশারায় বিবিকে পানি আনতে বলে। দু’গ্লাস পানি ঢকঢক করে সাবাড় করে কিছুটা ধাতস্থ হলেন তিনি।
“ কি হইছে-অমন করতাছো ক্যান গো?”
“না-কিছু না! খোয়াবে একজন কামেল লোকরে দ্যাখলাম।” মিথ্যে বলে মৃধা-সত্যকে চাপা দিতে। মৃধা সে রাতেই সিদ্ধান্ত নিলেন। রাত পোহালেই তিনি মজুর নিয়ে নতুন বাড়ির কাজ শুরু করবেন। বাড়ির নাম দিবেন “ প্রাণ কুঠির”।
ঘ.
ফজরের আযানের পর তিনি লোকজন নিয়ে হাজির হলেন বড়ভিটা বাজারের পাশে। শরফউদ্দিনকে খবর দিয়ে ডেকে এনেছেন মৃধা। বাজারের পাশে তার বেশ কিছু জমি আছে। উঁচুমত একটা জমি নির্বাচন করা হলো বাড়ির জন্য। মজুরদের কাজে লাগিয়ে দিলেন তড়িৎ। দো’চালা দু’টি টিনের ঘর। একটি রান্না ঘর। নিজের থাকবার ঘরসহ অন্য একটি ঘর ভেঙে এনে এখানে উঠাচ্ছেন। কালচে-মড়ছে পড়া টিনগুলোর মধ্যে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। রান্নাঘরটি খড়ের। পাটখড়ি দিয়ে বাড়ির সীমানা বেড়া নির্মিত হচ্ছে। পুকুরের খননকাজও চলছে দ্রুতগতিতে। মিস্ত্রি ও মজুরদের পদচারণায় মূখর মৃধার “ প্রাণকুঠির”। দুপুরের মধ্যেই অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মাইকে তখন বাজছে “ ভবে তাসরিফ আনিল মুহাম্মদ, এ দুনিয়া হয়িলো উজালা।”
ফজরের আযানের পর তিনি লোকজন নিয়ে হাজির হলেন বড়ভিটা বাজারের পাশে। শরফউদ্দিনকে খবর দিয়ে ডেকে এনেছেন মৃধা। বাজারের পাশে তার বেশ কিছু জমি আছে। উঁচুমত একটা জমি নির্বাচন করা হলো বাড়ির জন্য। মজুরদের কাজে লাগিয়ে দিলেন তড়িৎ। দো’চালা দু’টি টিনের ঘর। একটি রান্না ঘর। নিজের থাকবার ঘরসহ অন্য একটি ঘর ভেঙে এনে এখানে উঠাচ্ছেন। কালচে-মড়ছে পড়া টিনগুলোর মধ্যে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। রান্নাঘরটি খড়ের। পাটখড়ি দিয়ে বাড়ির সীমানা বেড়া নির্মিত হচ্ছে। পুকুরের খননকাজও চলছে দ্রুতগতিতে। মিস্ত্রি ও মজুরদের পদচারণায় মূখর মৃধার “ প্রাণকুঠির”। দুপুরের মধ্যেই অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মাইকে তখন বাজছে “ ভবে তাসরিফ আনিল মুহাম্মদ, এ দুনিয়া হয়িলো উজালা।”
মৃধা আরো দ্রুত গতিতে কাজ করার জন্য মিস্ত্রি-মজুরদের তাগিদ দিচ্ছেন। মৃধার চোখে-মুখে পরিতৃপ্তি ঝিলিক দিচ্ছে। অন্ততঃ আজ রাতেও তিনি যদি ইন্তেকাল করেন- তাহলেও বিবি ও আগত বংশধরের জন্য একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে যেতে পারবেন। বিবির নামে আলাদা দলিল করার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। কিন্তু এ সময়েই বাড়ির ভৃত্য মৃধার জন্য বয়ে আনে এক দুঃসংবাদ - মৃধা যা শোনার জন্য আদৌ প্র্স্তুত ছিলেন না। ক্ষাণিক আগে কমলা বিবি একটি পুত্র সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেছেন। নবজাত শিশুটিও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এ খবর শোনার পর মৃধা একবার নিশ্চল চোখে তাকান নির্মায়মান বাড়ির দিকে। কি যেন খোঁজেন তিনি । তারপর মূর্চ্ছা যান।
এই আকষ্মিক বিষাদের সংবাদ শুনে থেমে যায় মাইকের গান এবং মজুরদের কর্মঠ হাত।
[বিঃ দ্রঃ ছবি এবং গল্প রাইটারের ফেজবুক প্রফাইল থেকে সংগ্রহকৃত। রাইটারের ফেজবুক লিংক-

0 Comments
Post a Comment